সাবেক বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর আগে শেষ ১৫ মিনিটে কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা। টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে রাত ১টা ২০ মিনিটে এলাকা ছাড়ে। প্রায় একই সময়ে তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে বস্তিতে ফিরে আসতে দেখা যায়। এর ১৫ মিনিট পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মায়ের ফোনে একটি বার্তা আসে। কিন্তু তখন তাহসিফ কোথায় ছিলেন, তা জানা যায়নি।
তদন্তকারীরা অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাহসিফের মৃত্যুর আগের শেষ সাত ঘণ্টার বেশির ভাগ সময়ের গতিপথ শনাক্ত করেছেন। মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা, মোটরসাইকেল মেরামত, এক তরুণীর সঙ্গে রেস্তোরাঁয় যাওয়া এবং পরে বন্ধুকে নিয়ে বারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সবশেষে তিনি যান টঙ্গীর মাজার বস্তিতে। তবে সেখানে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যুর আগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের হিসাব এখনো মেলেনি।
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হত্যা মামলা করেন। মামলায় দীপ ও এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কয়েক দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
নৌপুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রিমান্ডে আসামিরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের বাকি কাজ শেষ করে ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে।
তদন্তে চার সম্ভাবনা
তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত কয়েকটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। পূর্বশত্রুতা, আর্থিক লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় দুর্ঘটনাবশত নদে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে কোনো সম্ভাবনাই এখনো নিশ্চিত হয়নি।
তৃতীয় দফা রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, হত্যার কারণ শনাক্ত করা জরুরি। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদের শনাক্ত এবং ভাড়াটে খুনি বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য ও আসামিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টঙ্গীতে কেন গিয়েছিলেন তাহসিফ
দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, ওই তরুণী ও তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি বারে যান। এর আগে ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য এক যুবকের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে তাহসিফ মন খারাপ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধও চলছিল বলে দীপ দাবি করেছেন।
দীপের ভাষ্য, বারে গিয়ে তাহসিফ সাউন্ড সিস্টেমে বিষণ্ন গান বাজাতে বলেন। পরে তিনজন মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য যুবকের সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি ওই তরুণীকে বলেন, তিনি ইয়াবার চেয়ে বড় কিছু, অর্থাৎ হেরোইন সেবন করবেন।
বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ওই তরুণীকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। এরপর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার দিকে রওনা হন। দীপের দাবি, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন।
দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে একটি মাঠে যান। সেখানে মাদকসেবী ও কারবারিদের ভিড় ছিল। তাহসিফ উচ্চ স্বরে হেরোইন চান এবং দাম নিয়ে আপত্তি নেই বলে জানান। পরে কয়েকজনের কাছ থেকে হেরোইন কিনে সেবন করেন। মদ্যপানের পর হেরোইন সেবনে তাহসিফ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন দীপ।
এরপর সেখানে পুলিশের একটি টহল দল আসে। দীপের ভাষ্য, পুলিশ দেখে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। তিনিও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান এবং তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকান। তখন তাহসিফের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। এরপর কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে দীপের বক্তব্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে যা পাওয়া গেছে
তদন্তকারীরা টঙ্গীর মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছেন। বস্তিতে প্রবেশের মুখের দুটি ক্যামেরায় রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে তাহসিফকে দ্রুতগতিতে ঢুকতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর দীপও সেখানে পৌঁছান।
মোটরসাইকেল রাখার জায়গা শনাক্ত করার পর দেখা যায়, রাত ১২টা ৪০ মিনিটে তাহসিফ ও দীপ একটি গলিতে ঢোকার চেষ্টা করছেন। এ সময় বস্তির এক নারী তাঁদের বাধা দেন। ওই নারীর ভাষ্য, তাহসিফকে ভেতরে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কারণ, সেখানে গেলে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু তাহসিফ তাঁর কথা না শুনে ভেতরে যাওয়ার কথা বলেন।
পরে তাঁরা গলি দিয়ে প্রধান সড়কে ওঠেন এবং নদীর তীরের দিকে যান। রাত ১২টা ৫২ মিনিটে মাজার গেটের সামনের ক্যামেরায় তাহসিফের চেহারা স্পষ্ট দেখা যায়। তাঁর পেছনে দীপও ছিলেন। এরপর আর ওই এলাকায় কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় তাঁদের গতিপথ শনাক্ত করা যায়নি।
রাত ১টা ৫ মিনিটে পিংকি গার্মেন্টসের সামনের ক্যামেরায় আট সদস্যের পুলিশের একটি দলকে মাঠে প্রবেশ করতে দেখা যায়। দীপের দাবি, পুলিশ দেখে সবাই দৌড়াতে শুরু করেন। তিনি নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে আশ্রয় নেন। আর তাহসিফ নদীর তীরের দিকে চলে যান। অন্ধকারে এরপর তাঁকে আর দেখতে পাননি বলে দাবি দীপের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পুলিশ অভিযান চালালে অনেকে ধরা পড়ার ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে অন্য পারে চলে যান। তাহসিফও পালাতে গিয়ে পানিতে পড়েছিলেন কি না, নাকি তাঁর সঙ্গে অন্য কিছু ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে মাজার গেটের সামনের ক্যামেরায় পুলিশের দলটিকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। একই সময় পিংকি গার্মেন্টসের ক্যামেরায় দীপকে বস্তিতে ফিরতে দেখা যায়। রাত ১টা ২১ মিনিটে আরেকটি ক্যামেরায় তাঁকে হাঁটতে দেখা যায়। এরপর আর কোনো ক্যামেরায় তাঁর উপস্থিতি মেলেনি। দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, রাত ১টা ৫২ মিনিটে তিনি তাহসিফকে রেখে বাসায় চলে যান। এই সময়ের মধ্যে তিনি কোথায় ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তাঁর বক্তব্য যাচাই করা হয়েছে। তাহসিফের মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারের ঘটনাসহ মোবাইল ফোনের তথ্য ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা নিয়েছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিবিআইয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মরদেহে আঘাতের চিহ্ন না থাকায় মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা কঠিন। ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত বা অনিশ্চিত বলে উল্লেখ থাকলে রহস্য উদ্ঘাটন আরও কঠিন হতে পারে।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁর প্রত্যাশা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসার নিচে নেমে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরদিন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৩০ অক্টোবর রাতে তাঁর বাবা হত্যা মামলা করার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর শেষ রাতের বেশির ভাগ গতিপথ পাওয়া গেলেও মৃত্যুর আগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কোনো নির্ভরযোগ্য ছবি বা প্রত্যক্ষ তথ্য নেই। তদন্তের বড় প্রশ্ন হয়ে আছে সেই ১৫ মিনিট।

