‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভে উত্তাল ছিল সচিবালয়। সোমবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা অফিসের কাজ ফেলে মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, এই অধ্যাদেশ ‘কালো আইন’। যতক্ষণ না এটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হচ্ছে, ততক্ষণ আন্দোলন চলবে। আজ মঙ্গলবারও মিছিলের ঘোষণা এসেছে। কর্মচারী নেতাদের দাবি, এখন শুধু সচিবালয় নয়, সারা দেশের সরকারি কর্মচারীরাও এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
গত তিন দিন ধরে সচিবালয়ের ভেতরে একাধিক সংগঠনের ডাকে এই কর্মসূচি চলছিল। সোমবার সব সংগঠন একত্র হয়ে ‘বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরাম’ নামে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
এদিকে, সচিবালয়ে আজ মঙ্গলবার সকল দর্শনার্থীর প্রবেশ বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার রাতে জননিরাপত্তা বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) থেকেও সোমবার রাতে একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনা এবং আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত, মিছিল ও শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আগেই জারি ছিল। গত ১০ মে জারিকৃত এই নিষেধাজ্ঞা আবারও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ সংশোধনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কর্মচারীদের মধ্যে। রোববার সন্ধ্যায় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে।
কর্মচারীদের অভিযোগ, এই অধ্যাদেশে ৪৫ বছর আগের কিছু ‘নিয়ন্ত্রণমূলক ধারা’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সোমবার সকাল ১১টায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা সচিবালয় চত্বরে বাদামতলায় জমায়েত হন। এরপর তারা মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের বিভিন্ন অংশ ঘুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবনের নিচে সমাবেশ করেন। সেখান থেকে ফের মিছিল নিয়ে আবার বাদামতলায় ফিরে আসেন। একপর্যায়ে তারা সচিবালয়ের প্রধান ফটকের কাছেও যান।
এ সময় সচিবালয়ের কয়েকটি ফটক কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। পরে তারা আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে ফিরে আসেন।
বেলা আড়াইটার দিকে ঐক্য ফোরামের নেতারা পরবর্তী দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের একাংশের সভাপতি মো. বাদীউল কবীর বলেন, যতক্ষণ না ‘কালো আইন’ বাতিল হচ্ছে, ততক্ষণ আন্দোলন চলবে।
তিনি মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে মিছিল নিয়ে বাদামতলায় জমায়েত হওয়ার আহ্বান জানান।
ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান ও পরিষদের আরেকাংশের সভাপতি মুহা. নূরুল ইসলাম জানান, সারা দেশের কর্মচারীরা এই আন্দোলনে সমর্থন জানাচ্ছেন।
আন্দোলনকারী নেতারা জানান, সোমবার আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের সঙ্গে তাঁদের বৈঠকের কথা থাকলেও রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় তা সম্ভব হয়নি। সময় নির্ধারণ হলে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। আইন অনুযায়ী সবাইকে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ধরা হয়।
নতুন অধ্যাদেশে চারটি কাজকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে-
১. কোনো সরকারি কর্মচারী যদি এমন কিছু করেন যা অনানুগত্যের শামিল, অন্য কর্মচারীর মধ্যেও অনানুগত্য তৈরি করে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে।
২. ছুটি ছাড়া বা যৌক্তিক কারণ ছাড়া কাজে অনুপস্থিত থাকেন বা দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন।
৩. অন্যকে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে উৎসাহ দেন বা প্ররোচনা দেন।
৪. অন্যকে কাজে আসা বা দায়িত্ব পালনে বাধা দেন।
এই কাজগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে অসদাচরণের দায়ে শাস্তি দেওয়া হবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অভিযোগ ওঠার সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আরও সাত কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে শাস্তি আরোপ করা যাবে।
দোষী কর্মচারী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা যাবে না। চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে।
আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের ডাকে আজ থেকে কলমবিরতিতে যাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া সিভিল সার্ভিসের ২৫টি ক্যাডার কর্মকর্তারা।
তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলার প্রতিবাদে, উপসচিব পদে কোটা বাতিল এবং নিজ নিজ ক্যাডারভিত্তিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাঁরা এই কর্মসূচি নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার ও বুধবার, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ অন্যান্য জরুরি সেবা এই কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকবে।
পরিষদের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির জন্য ২৫ ক্যাডারের ১২ জন সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সরকার আশ্বাস দিলেও দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলে আছে। বরং নতুন করে কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অনেক নিয়ম বহির্ভূত কাজের পরও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিসংখ্যান, ডাক, পরিবার-পরিকল্পনা, কাস্টমস ও ট্যাক্স ক্যাডারকে নানা জটিলতায় ফেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

