গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ নির্যাতন, বিচার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের এক করুণ চিত্র। কমিশনের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন প্রয়োগ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিরোধীদের অপরাধী বানিয়ে রাষ্ট্রীয় দমননীতি বৈধতা পেয়েছে। প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে র্যাব, ডিজিএফআই ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন সংস্থার হেফাজতে আটক ব্যক্তিদের জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়, গুমের ঘটনা, এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকা। এতে দেখা যায়, ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করে বিচারকেরা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে একাট্টা হয়ে কাজ করেছেন।
একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নেওয়ার আগে জোরপূর্বক জবানবন্দি মুখস্থ করানো হয়েছে ভুক্তভোগীদের। তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, ম্যাজিস্ট্রেটরা জবানবন্দি নিতে গিয়ে আসামিদের একান্ত কথা বলার সুযোগ দেননি, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই ‘জোর করে’ জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন।
এক ১৯ বছর বয়সী তরুণ জানান, তাকে ২৮ দিন গুম রাখার পর র্যাব কর্মকর্তারা স্বীকারোক্তির খসড়া তৈরি করে মুখস্থ করান এবং তা আদালতে উপস্থাপনের মহড়া চালান। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একান্তে কথা বলার আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। উল্টো ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, উনারা (র্যাব সদস্যরা) বের হবে না, যা বলার এখানে বল। আরেক ঘটনায়, ৩৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, তার চোখ বাঁধা অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট তার কাছ থেকে ‘জোর করে’ স্বীকারোক্তি নিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি বলছিলাম আমার বাসায় বই ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতাম। কিন্তু ওরা লিখছে আমি জিহাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ম্যাজিস্ট্রেটরা অনেক সময় কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই জবানবন্দিতে সিল-ছাপ্পড় দিয়ে দেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের বয়ানের সঙ্গে রেকর্ডকৃত জবানবন্দির কোনো মিল ছিল না, যা শুধু চাপ প্রয়োগ নয়, বরং মনগড়া স্বীকারোক্তির প্রমাণ। আইনি প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতিও একটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। গুম অবস্থায় আটক ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করা হলেও আইনজীবীর সাহায্য নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এতে করে আদালতে ন্যায়বিচারের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
২০১৯ সালে র্যাবের হাতে ১৩ দিন গুম থাকা একজন জানান, আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে জিজ্ঞেস করেন উকিল আছে কি না। তিনি বলেন, গুম অবস্থায় সরাসরি ওখানে নিয়ে গেছে, কেমনে উকিল ধরব? কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৈরি জবানবন্দি মুখস্থ করিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তা বলতে বাধ্য করা হত। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের বলা হতো জবানবন্দি না দিলে আবার রিমান্ডে নেওয়া হবে, গুরুতর মামলায় ফাঁসানো হবে, এমনকি ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হবে।
২০২১ সালে সিটিটিসির হাতে ৩২ দিন নিখোঁজ থাকা এক ব্যক্তি বলেন, তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যদি তিনি ১৬৪ না দেন, তাহলে তার স্ত্রীকে ধরে আনা হবে এবং তিনিও নির্যাতনের শিকার হবেন। ২০২০ সালের আরেক ঘটনায়, ভুক্তভোগী বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ডাক দিয়ে বললেন, আপনাদের আসামি তো ভালো করে স্বীকারোক্তি দিচ্ছে না। তারপর আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে শাসিয়েছেন।
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলকে বিবেচনায় নিয়ে তৈরি এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচারিক প্রক্রিয়াকে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক দমননীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রিমান্ড, মামলা দায়ের এবং স্বীকারোক্তি আদায়ে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটেছে। এসব ঘটনা থেকে একটি ‘সিস্টেমেটিক প্যাটার্ন’ বা ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আইন অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্ব হলো আসামিকে জানানো যে, তিনি স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য নন এবং তা তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই নির্দেশনা অনুসরণ না করেই জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন অনেক বিচারক।প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, গুম ও নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষিতে বিচার বিভাগ কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এসব ঘটনা বিভিন্ন মামলার মাধ্যমে আদালতের নজরে এলেও তারা নিরব ভূমিকা পালন করেছে। কমিশন তার অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে সরকারকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে। অতীত সংশোধনের অংশ হিসেবে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে এক বছরের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা সাজানো মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়েছে।
একটি মানবিক ও পুনর্বাসনমুখী সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তাবাদী মডেল’ থেকে সরে এসে চরমপন্থার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক উৎসগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে। এই প্রতিবেদনের আলোকপাত করা তথ্য শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বিচার বিভাগ নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। মানবাধিকারের নামে আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

