একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার। বিচারব্যবস্থা কার্যকর না থাকলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মানুষের জীবন, সম্পদ, অধিকার ও মর্যাদা কোনো কিছুই নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখন কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা টেকসই হয় না।
উন্নয়নের প্রতিটি ধাপের আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ কিন্তু বিচার ব্যবস্থা যদি ধীরগতির হয়, অবকাঠামোগত সংকটে ভোগে এবং সক্ষমতার ঘাটতিতে থাকে, তাহলে তার প্রভাব পুরো রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে পড়ে। বিচার প্রক্রিয়ার এই দুর্বলতা সমাজে আস্থার সংকট তৈরি করে।
একটি রাষ্ট্রকে বাইরে থেকে যতটা উন্নত দেখাক না কেন, তার ভেতরের শক্তি নির্ভর করে ন্যায়বিচারের ওপর। রাস্তা, সেতু বা বড় অবকাঠামো চোখে পড়ে, কিন্তু বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়। অথচ সেই আড়ালেই তৈরি হয় আস্থার সংকট, ধীরে ধীরে ক্ষয় হয় রাষ্ট্রের ভিত।
যেখানে বিচার দ্রুত ও কার্যকর, সেখানে নাগরিকের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থা গড়ে ওঠে। আর যেখানে বিচার বিলম্বিত ও দুর্বল, সেখানে উন্নয়নের অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ উন্নয়ন কেবল নির্মাণে নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সক্ষমতায়ও পরিমাপ করা হয়।
এই বাস্তবতায় বাজেটের অঙ্ক, বরাদ্দের হার কিংবা খাতভিত্তিক হিসাবের বাইরে গিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি ন্যায়বিচারকে তার প্রকৃত ভিত্তি হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে? নাকি উন্নয়নের দৃশ্যমান কাঠামোর আড়ালে অদৃশ্য এই ভিত্তিটিই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে? শেষ পর্যন্ত ভাবনার জায়গাটা এখানেই—যে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার শক্ত নয়, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন কতটা স্থায়ী হতে পারে?
বাজেট বরাদ্দ ও বিচার বিভাগের বাস্তব চ্যালেঞ্জ:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। সংখ্যাগতভাবে বরাদ্দে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেলেও, বাস্তব চাহিদার তুলনায় এই অগ্রগতি যথেষ্ট কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
দেশের বিচারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মামলা জট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের ঘাটতির মতো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বরাদ্দের পরিমাণ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোট জাতীয় বাজেটের তুলনায় আইন ও বিচার বিভাগের অংশ মাত্র প্রায় ০.২৩ শতাংশ। অথচ এই বিভাগই নাগরিকের অধিকার, সম্পদ, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার চূড়ান্ত আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রের আইনের শাসন, সামাজিক সমতা এবং স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তিও এই বিচার ব্যবস্থা।
বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করার অর্থই হলো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা। কিন্তু বাজেট কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই খাতটি এখনো রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি। ফলে বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির যে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, তা বাস্তবায়নে আরও সুস্পষ্ট নীতিগত গুরুত্ব ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
উন্নয়ন বরাদ্দে সংকোচন ও উদ্বেগ:
বরাদ্দের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৫৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৮৯৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ২৬৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতে মোট বরাদ্দ কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে এই বৃদ্ধির ভেতরেও খাতভিত্তিক ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা গেছে। নতুন প্রস্তাবে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমিয়ে ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলে দেখা যায়, মোট বরাদ্দ প্রায় ২৮ কোটি টাকা বাড়লেও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। এই প্রবণতা বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
কারণ বিচার বিভাগের কাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং সেবার মানোন্নয়নের মূল ভিত্তিই হলো উন্নয়ন ব্যয়। উন্নয়ন খাতে কম বরাদ্দ মানে অবকাঠামো সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সেবার আধুনিকীকরণের গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
উন্নয়ন বরাদ্দ হ্রাসের বহুমাত্রিক প্রভাব:
বিচার বিভাগের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার প্রভাব কেবল একটি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বহুমাত্রিকভাবে পুরো বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অবকাঠামোগত সংকট:
দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলা জট কমাতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও অনেক জায়গায় এখনো পর্যাপ্ত এজলাস, আদালত ভবন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়ে গেছে। নতুন আদালত ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনের সম্প্রসারণ ও সংস্কার, এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উন্নয়ন বাজেট হ্রাস সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিজিটাল রূপান্তরে বাধা:
আধুনিক বিচারব্যবস্থা ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ই-আদালত, ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিচারিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়ন বরাদ্দ সংকুচিত হলে এই ডিজিটাল রূপান্তরের গতি স্বাভাবিকভাবেই মন্থর হয়ে যেতে পারে।
বিচারকদের আবাসন ও নিরাপত্তা:
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারকদের জন্য এখনো পর্যাপ্ত আবাসন, নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং কার্যকারিতা বজায় রাখতে এসব খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বরাদ্দ কমে গেলে এই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগগুলোও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
চৌকি আদালতের জরাজীর্ণ অবস্থা:
দেশের বহু আঞ্চলিক ও চৌকি আদালত এখনো পুরোনো এবং অনুপযোগী ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকর অবকাঠামো নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে গেলে এসব জরুরি উদ্যোগ বাস্তবায়ন আরও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
ন্যায়বিচার: ব্যয় নয়, রাষ্ট্রের কৌশলগত বিনিয়োগ
প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার কোনো সাধারণ রাষ্ট্রীয় ব্যয় নয়। এটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা সরাসরি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিচারব্যবস্থা যত শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্র ততই আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ পরিবেশ খোঁজেন, নাগরিকরা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা চান, আর সমাজ চায় স্থিতিশীলতা। এই সবকিছুর ভিত্তিই হলো একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। মামলা জট নিরসন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আরও বিস্তৃত ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য বিচার বিভাগের উন্নয়নকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা জরুরি। কারণ শক্তিশালী বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, আর আইনের শাসন ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই বিচার বিভাগের বাস্তব প্রয়োজন, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই খাতে আরও বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা খুব সরল হলেও গভীর। একটি রাষ্ট্র কি কেবল সেতু, সড়ক বা বড় বড় অবকাঠামোর অঙ্কে উন্নত হয়, নাকি সেই রাষ্ট্র সত্যিকারের শক্তি পায় তার বিচারব্যবস্থার ভিত থেকে? বাজেটের কাগজে উন্নয়ন যতই দৃশ্যমান হোক, ন্যায়বিচারের ঘাটতি থাকলে সেই উন্নয়ন নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে পারে না। কারণ, যে সমাজে বিচার বিলম্বিত হয়, সেখানে অধিকারও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তায়ও প্রতিফলিত হয়। তাই এখনই সময় বিচার বিভাগকে কেবল একটি প্রশাসনিক খাত হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি প্রশ্নের উত্তরেই—ন্যায়বিচার কতটা কার্যকর, কতটা সহজলভ্য এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্য।
সিভি/এম

