বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তি নির্ভরতায় দ্রুত এগিয়ে চললেও একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। বাংলাদেশেও এর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় তথ্যের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল প্রযুক্তি নির্ভরতা নয়, প্রয়োজন সুসংগঠিত ও সমন্বিত পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
সাইবার অপরাধ বলতে মূলত ইন্টারনেট, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, ডিজিটাল অর্থ জালিয়াতি, গুজব ছড়ানো, পর্নোগ্রাফি ছড়ানো, ফিশিং, হ্যাকিং ও ডেটা ম্যানিপুলেশন।ফেসবুক,টুইটার,গুগল,ইনস্টাগ্রাম,স্কাইপিতে ভুয়া আইডি খুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ এসব অপরাধ শুধু ব্যক্তিকে নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলেও এখনো সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে গুটিকয়েক সংস্থা। অপরাধীদের ধরতে যথাযথ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মানবসম্পদের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), সিআইডির সাইবার ইউনিট, ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি, ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) বিভিন্নভাবে কাজ করলেও এখনো এদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। প্রযুক্তি খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত একটি ‘সাইবার নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক’, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত এবং জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
সাইবার অপরাধীদের ধরতে প্রয়োজন উচ্চমানের ট্রেনিংপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ, যাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা থাকবে। একই সঙ্গে, জনগণকে সচেতন করতে নিয়মিত ক্যাম্পেইন, স্কুল-কলেজে ডিজিটাল লিটারেসি শিক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাইডলাইন প্রচার করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়, ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, ডিজিটাল মিথ্যাচার কিংবা প্রতারণা করা হচ্ছে—যা অনেক সময় আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়। এ ধরনের ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে প্রযুক্তির ব্যবহার জানা যেমন জরুরি, তেমনি আইনি সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমান ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। আর সাইবার অপরাধের ৭৫ ভাগ অভিযোগই ফেসবুক কেন্দ্রিক। ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়রানি ও প্রতারনার শিকার হওয়া ৪৯ শতাংশ স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে একটি উদ্যোগ ছিল। তবে এ আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক থাকলেও সাইবার অপরাধ দমনে এটি একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, যথাসময়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো। সাইবার অপরাধ আন্তর্জাতিক সীমানা ছাড়িয়ে হওয়ায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অপরাধীরা অনেক সময় দেশের বাইরে থেকে অপরাধ সংঘটিত করে, যাদের শনাক্ত ও শাস্তির আওতায় আনতে ইন্টারন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি চুক্তি এবং তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা যেমন সার্ক বা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা যেতে পারে।
অপরদিকে, অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেন, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিংসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জালিয়াতির ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও এর প্রয়োগে ধীরগতি ও প্রশাসনিক জটিলতা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তির সম্ভাবনা যেমন অনেক, তেমনি এর অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে সামগ্রিক উন্নয়নের গতি থেমে যেতে পারে। তাই এখনই সময়, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের। যেখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসচেতনতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ‘প্রতিরোধ’ ও ‘প্রতিকার’ উভয় বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। শুধুমাত্র অপরাধের পর তদন্ত নয়, বরং অপরাধ যেন ঘটতেই না পারে এমন পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে মানুষের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে, নইলে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে।

