ন্যায়বিচার শব্দটি মানবিক আদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে বাস্তবে এটি প্রায়ই আপেক্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। সময়, স্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী ন্যায়বিচারের রূপ বদলায়। কোনো অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াগতভাবে সম্পন্ন হলেও, তা কার্যকর না হলে প্রশ্ন ওঠে—সেটাই কি প্রকৃত ন্যায়বিচার? এমন প্রশ্ন বারবার উঠে আসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও, যেখানে বিচার অনেক সময়ই ক্ষমতার রাজনীতিতে গৌণ হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক প্রয়াস মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
প্রাচীন দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে যে রাষ্ট্রকাঠামোর কথা বলেন, তার ভিত্তিই ছিল ন্যায়বিচার। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই আদর্শ হবে, যখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সমান ন্যায় নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু আধুনিক বাস্তবতায় সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য যা ন্যায়, সংখ্যালঘুর জন্য তা অবিচার হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই কারণেই ন্যায়বিচারকে কোনো একক সংজ্ঞায় বাঁধা প্রায়ই অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রায়াল দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব। এরপর জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ গ্রহণ করে। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই গৃহীত হয় রোম সংবিধি, যার ভিত্তিতে ২০০২ সালে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। সেই ১৭ জুলাই দিনটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে রোম সংবিধি অনুমোদন করে। একাত্তরের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালায়—যা আন্তর্জাতিক আদালতের নজরে আসে। যদিও মিয়ানমার রোম সংবিধির সদস্য নয়, তবু বাংলাদেশ সদস্য হওয়ায় রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে স্থানান্তর আইসিসির বিচারিক আওতায় পড়ে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর মুখপাত্র বাবর বালুচ জানান, এতে ত্রাণ পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় গণহত্যার অভিযোগ তুলে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। তাদের ভাষায়, এটি একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত গণহত্যা। ইসরায়েল এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে, হামাসই প্রকৃত অপরাধী। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) আদেশ দিলেও বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা তাদের নেই। তাদের নিজস্ব কোনো বাহিনী না থাকায় রায় কার্যকরে নির্ভর করতে হয় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর। ফলে অনেক সময়ই রায় বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী দেশ এখনো আইসিসিকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে এ দেশগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ইরাকে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধ শুরু করা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধেও আইসিসি কার্যকর অবস্থান নেয়নি। একইভাবে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। অথচ আফ্রিকার বহু নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ পক্ষপাত আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, “ন্যায়বিচার মানবাধিকারের ভিত্তি হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। যেখানে গণতন্ত্র নেই, বাকস্বাধীনতা নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই– সেখানে ন্যায়বিচারও থাকে না। আন্তর্জাতিক বিচারেও এমন বৈষম্য স্পষ্ট।” তিনি বলেন, “আজ জনমতই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ প্রশ্ন করতে পারছে। তাই বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাত উন্মোচিত হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার এখনও হয়তো কেবল স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই আমাদের হাঁটতে হবে।”
সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা মানবতার পক্ষে এক নৈতিক বার্তা দেয়। অনেক অপরাধী অধরা থাকলেও এসব আদালত বিশ্বজুড়ে বিচার ও জবাবদিহির দাবিকে শক্তিশালী করে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে, তখন ন্যায়বিচারের এ যাত্রাকে থামিয়ে না রেখে বরং আরও জোরদার করাই মানবতার পথ।

