দশ বছর আগে যুক্তরাজ্যের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত শুধু একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না, বরং এটি ইউরোপীয় রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। আজ এক দশক পর আবারও প্রশ্ন উঠছে—ব্রেক্সিট কি সত্যিই অনিবার্য ছিল, নাকি এটি ছিল একাধিক রাজনৈতিক ভুল, সামাজিক চাপ এবং ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সমষ্টিগত ফলাফল?
এই প্রশ্ন বুঝতে হলে শুধু ২০১৬ সালের গণভোট নয়, তার আগের অন্তত এক দশকের ইউরোপীয় পরিবর্তনগুলোও বোঝা জরুরি। ২০০৪ সাল ছিল ইউরোপীয় ইতিহাসে এক বড় মোড়, যখন দশটি দেশ একসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। এর মধ্যে আটটি ছিল সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর আগে ২০০২ সালে ইউরো মুদ্রা চালু হয় এবং শেনজেন ব্যবস্থার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সীমান্ত প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। এক সময় এটি ইউরোপীয় একীকরণের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখা হতো, যেখানে মনে করা হতো যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক একীকরণ স্বাভাবিক এবং প্রায় অনিবার্য একটি প্রক্রিয়া।
কিন্তু এই সাফল্যের ভেতরেই ধীরে ধীরে সংকট জমতে শুরু করে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ইউরোজোনের কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। একক মুদ্রা থাকলেও রাজনৈতিক ও আর্থিক একীকরণ না থাকায় অনেক দেশ চাপে পড়ে যায়। একই সময়ে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক আগ্রাসন নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করে, বিশেষ করে জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ইউরোপীয় স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দেয়।
এরপর আসে অভিবাসন সংকট। ২০১৫ সালের শরণার্থী প্রবাহ এবং আরব বসন্তের ব্যর্থতার পর ইউরোপজুড়ে সামাজিক উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মুক্ত চলাচলের নীতি অনেকের কাছে সুবিধার পাশাপাশি অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সব ঘটনাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আস্থার ভিত্তিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয় এবং ব্রেক্সিট গণভোটের জন্য একটি অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ধারণা করেছিলেন, গণভোট তার দলের ভেতরের ইউরোপ-বিরোধী অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো ফল দেয় এবং খুব অল্প ব্যবধানে জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দেয়। যদিও এটি একটি নির্দিষ্ট দিনের সিদ্ধান্ত ছিল, তবে এর পেছনে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং সাংস্কৃতিক বিভাজন।
ব্রেক্সিটের পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে একের পর এক বড় পরিবর্তন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান, বৈশ্বিক কোভিড মহামারি, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত এবং পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন অনেক বিশ্লেষকের কাছে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা দেয়। কেউ কেউ মনে করেন, ব্রেক্সিট এই বৈশ্বিক অস্থিরতার একটি সূচনাবিন্দু, আবার কেউ বলেন এটি ছিল বৃহত্তর কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি প্রতিফলন মাত্র।
এখানেই মূল বিতর্ক তৈরি হয়—ব্রেক্সিট কি সত্যিই এড়ানো যেত? এক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয়, ভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হিসেবে থাকতে পারত এবং অনেক বৈশ্বিক ঘটনা ভিন্ন পথে যেতে পারত। অন্যদিকে আরেকটি শক্তিশালী বিশ্লেষণ বলে, ব্রেক্সিট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা অর্থনৈতিক বৈষম্য, অভিবাসন চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং বিশ্বায়নের প্রতি অসন্তোষের স্বাভাবিক পরিণতি।
এই আলোচনার মধ্যেই আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে—ইতিহাস কি সত্যিই অনিবার্য? ইউরোপীয় একীকরণের এক সময়কার ধারণা ছিল যে শান্তি, গণতন্ত্র এবং সহযোগিতা একটি স্বাভাবিক ও অবিচ্ছিন্ন অগ্রগতির পথ। কিন্তু ব্রেক্সিট সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দেখায় যে ইতিহাস সবসময় সরলরেখায় চলে না। ছোট ছোট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ভুল হিসাব এবং জনমতের পরিবর্তন বড় ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে এটাও সত্য যে ইতিহাস শুধু ভাগ্য বা অনিবার্যতার ওপর নির্ভর করে না। এটি মানুষের সিদ্ধান্ত, প্রত্যাশা, ভয় এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফলাফল। তাই ব্রেক্সিটকে শুধুই অনিবার্য বা শুধুই ভুল—এই দুইয়ের কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু অতীতের নয়, ভবিষ্যতেরও। ব্রেক্সিট আমাদের দেখায় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কখনো একক কারণের ওপর দাঁড়ায় না। বরং তা সময়, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জটিল সংযোগ থেকে জন্ম নেয়। তাই ইতিহাসকে বুঝতে হলে অনিবার্যতার ধারণা থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে বিকল্প সম্ভাবনাগুলো নিয়েও ভাবতে হয়, কারণ ইতিহাস সবসময় তৈরি হয়, লেখা থাকে না।

