নিখোঁজ বা গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো আইন নেই। সাধারণ পার্সোনাল ল-এর বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম থাকলেও গুম বা নিখোঁজের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। এই অবস্থায় নিখোঁজ বা গুম হওয়া ব্যক্তির ওয়ারিশ—যেমন পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান এবং কিছু ক্ষেত্রে ভাই-বোন—কতদিন পর বা কোন তারিখ থেকে সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার পাবেন, তা আইনিভাবে পরিষ্কার নয়। এই ধরনের প্রশ্নের সমাধান পেতে সাধারণত বিভিন্ন আইনের সমন্বয়ে আদালতের পথ অনুসরণ করতে হয়।
বাস্তবতার দিক থেকে, গুম হওয়া বা নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারকে স্বস্তি দিতে সম্প্রতি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালে প্রণীত হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার—বিশেষ করে স্ত্রী বা সম্পত্তির ওপর নির্ভরশীল সদস্য—পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষার পর সেই ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার এবং হস্তান্তর করতে পারবে। তবে এটি সীমিতভাবে প্রযোজ্য, শুধুমাত্র যৌক্তিক জীবনধারণ এবং ব্যয় নির্বাহের জন্য।
আইনের প্রক্রিয়া অনুযায়ী, আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে আবেদন করতে হবে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবেদন বিবেচনা করে গুম সনদ ইস্যু করবেন। এই সনদের ভিত্তিতে গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার বা নির্ভরশীল সদস্যরা সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে এবং কিছু ক্ষেত্রে হস্তান্তরের অনুমতিও পাবে। কিন্তু সম্পত্তি বণ্টন বা ওয়ারিশগণের মালিকানা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাওয়ার বিষয়টি এখানে অন্তর্ভুক্ত নয়।
বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট আইন না থাকলেও, সাক্ষ্য আইন ধারা ১০৮ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করা যেতে পারে, যদি নিখোঁজের তারিখ থেকে সাত বছর ধরে তার কোনো খোঁজ বা বেঁচে থাকার প্রমাণ না থাকে। আন্তর্জাতিক আইনে, জাতিসংঘের ১৯৫৬ সালের কনভেনশন অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিকে পাঁচ বছর পর মৃত ঘোষণা করা যায়। এই আইন অনুযায়ী, নিখোঁজের তারিখ থেকে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলে পরিবার আদালতে আবেদন করে সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত বন্দোবস্ত করতে পারবে। বাংলাদেশও এই নিয়মটি গ্রহণ করেছে।
তুলনামূলকভাবে, মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনে স্বামী চার বছর ধরে নিখোঁজ থাকলে স্ত্রী তাকে তালাক দিতে পারে। অর্থাৎ, গুম বা নিখোঁজ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সময়সীমা আইনভেদে বিভিন্ন। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী পাঁচ বছর, সাক্ষ্য আইনে সাত বছর, আন্তর্জাতিক কনভেনশনে পাঁচ বছর, মুসলিম আইনে চার বছর। তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি মালিকানা বা বণ্টনের জন্য নির্দিষ্ট বিধান নেই। যতদূর সম্ভব, সম্পত্তি শুধুমাত্র পরিবার বা নির্ভরশীলদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ওয়ারিশ হিসেবে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি পেতে হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা আবশ্যক। বিভিন্ন আইনে নিখোঁজ বা গুম ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করার সময়সীমা ভিন্ন হলেও, বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে চার বছরের পর গুম বা নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করে সম্পত্তির বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ সাময়িক সমাধান হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে নতুন আইন বা সংশোধনের মাধ্যমে নিখোঁজ বা গুম ব্যক্তির মৃত ঘোষণা এবং ওয়ারিশদের সম্পত্তি মালিকানা ও ব্যবহারের জটিলতা পূর্ণাঙ্গভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।

