রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্কের অনুভূতি রয়েছে। এলাকাটির নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে অপরাধ ও সহিংসতার ছবি ভেসে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে অপরাধ শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বহুদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত নেটওয়ার্কের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ অঞ্চলে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী গ্রুপ এবং নানা ধরনের অপরাধচক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন গ্রুপের আলাদা আলাদা নেতৃত্ব রয়েছে, যারা এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। প্রকাশ্যেই অস্ত্রের মহড়া, সহিংসতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটার অভিযোগও রয়েছে। এই ধারাবাহিক সহিংসতার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে গত রবিবার রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর হোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমন নিহত হন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, ইমনের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও হত্যাসহ একাধিক মামলা ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই রায়েরবাজার এলাকায় এলেক্স ইমন গ্রুপ এবং আরমান-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে বিরোধ চলছিল। এর জেরেই ওই দিন বিকেলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একদল সদস্য অস্ত্র নিয়ে অন্য পক্ষকে ধাওয়া করছে। এক পর্যায়ে ইমন পড়ে যান এবং পরে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় বলে জানা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয় সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুরকে অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও থানা বিভাজন করে আদাবর থানা গঠন করার পরও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং বিভিন্ন সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ অঞ্চলের অপরাধ পরিস্থিতি গড়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে—দীর্ঘদিনের মাদক কারবার, জেনেভা ক্যাম্প কেন্দ্রিক প্রভাব, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ এবং আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা। এসব মিলিয়ে মোহাম্মদপুর রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
চুরি, ছিনতাই, হত্যা, জমি দখল, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ এখানে নিয়মিতভাবে উঠে আসে। দিন-রাত সব সময়ই অস্ত্রের উপস্থিতি ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার জন্য সুবিধাজনক ভূমিকা রাখে। পশ্চিম পাশে নদী ও চর এলাকা থাকায় অপরাধ সংঘটনের পর সহজেই পালানোর পথ তৈরি হয়।
বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে গড়ে ওঠা নতুন হাউজিং এলাকা এবং বস্তিগুলোও অপরাধীদের চলাচলের সুযোগ তৈরি করে। উত্তরে আদাবর থানা এলাকা, যা অনেক সময় মোহাম্মদপুরের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়, সেখান থেকেও অপরাধীরা সহজে সরে যেতে পারে। পূর্ব পাশে জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় মাদক ও অপরাধচক্রের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণে হাজারীবাগের নিম্ন আয়ের বসতি ও বস্তি এলাকা থেকেও অপরাধীরা দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ ও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর থানায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০০টি মামলা হয়। গত মাসে ৯৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আশপাশের কয়েকটি থানার সম্মিলিত মামলার সমান। পুলিশ বলছে, অপরাধের বিস্তার ও জটিলতার তুলনায় জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়, পুলিশ ও র্যাব সূত্র অনুযায়ী মোহাম্মদপুরে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি সক্রিয় গ্যাং রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা শতাধিক থেকে এক হাজার পর্যন্ত বিস্তৃত।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্যাংয়ের মধ্যে রয়েছে—কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ, কিলার আকরাম গ্রুপ, টুণ্ডা বাবু গ্রুপ, পানি রুবেল গ্রুপ, বোমা আরমান গ্রুপ, গিটঠা মিঠু গ্রুপ, কসাই সোহেল গ্রুপসহ আরও কয়েকটি চিহ্নিত চক্র।
এছাড়া নবী হোসেন গ্রুপ, এক্সেল বাবু গ্রুপ, পাপ্পু গ্রুপ, কিলার বাদল গ্রুপ, কিলার লাল্লু গ্রুপ, জনি রনি কিশোর গ্যাং এবং গাংচিল বাহিনীর লম্বু মোশারফ গ্রুপের নামও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। র্যাবের তালিকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে মো. জহিরুল ইসলাম ও মো. লিয়াকত আলী লিমনের নাম রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এসব গ্রুপের হাজারের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব গ্যাংয়ের প্রভাবের কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। এমনকি মামলা করতেও অনেকে অনীহা প্রকাশ করেন। কিছু ভুক্তভোগী গোপনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
চলতি মাসের ৭ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টার দিকে শেরশাহসুরী রোডে দুই ছিনতাইকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে সামুরাই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এক ব্যক্তির মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তবে যেসব ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়, সেগুলোই সাধারণত গুরুত্ব পায়। অন্যান্য অনেক ঘটনা জিডি পর্যায়ে থেকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক সময় তদন্ত প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে এগোয় না এবং অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।
কার অধীনে কোন মহল্লা পরিচালিত হচ্ছে:
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা এলাকা ২৯, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকাগুলোর বিভিন্ন অংশে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একাধিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অবস্থান রয়েছে বলে জানা যায়।
২৯ নম্বর ওয়ার্ডে লিটন মাহমুদ বাবু ওরফে ‘তেরেনাম বাবু’ পুরো মোহাম্মদপুরে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি ‘তেরেনাম বাবু’ নামেই পরিচিত।
এই ওয়ার্ডের জহুরী মহল্লায় ইমন মুন্সী, বিজলি মহল্লায় শুক্কুর আলামীনের প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়। টিক্কাপাড়া, আজিজ মহল্লার একটি অংশ এবং সূচনা কমিউনিটি সেন্টার এলাকার রিং রোডের অংশ কাইয়ুমের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কৃষি মার্কেট ও এর আশপাশের আজিজ মহল্লার অংশ, পাশাপাশি লাগোয়া বিহারি ক্যাম্প এলাকায় এনামুল হক রবিনের প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে রবিন ও ঢালী মিয়ার প্রভাবের কথা উল্লেখ রয়েছে পুলিশের তথ্যে।
মোহাম্মদপুরের সবচেয়ে আলোচিত এলাকা হিসেবে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডকে চিহ্নিত করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ সন্ত্রাসী বাদল ওরফে ‘কিলার বাদল’-এর নেতৃত্বে এখানে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তাঁর নির্দেশে এই চক্রগুলো মোহাম্মদপুরজুড়ে ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, কিলার বাদলের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ শতাধিক মামলা রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে লালু উদ্দিন লালুর নাম আসে, যিনি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ।
এই ওয়ার্ডে আরও কয়েকজনের নাম বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে, যাদের মধ্যে রয়েছে পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু, মোল্লা কাওসার (বর্তমানে কারাগারে), কাইল্লা বাদল, ঘাট বাবু, হাবিব, আহমেদ আলী, মান্নান, কিশোর গ্যাং লিডার মাহি এবং গ্যারেজ সোহেল। র্যাবের অভিযানে গ্যারেজ সোহেলকে চলতি বছরের ১ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে বিদেশি রিভলবার ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জানা যায়। পুলিশের তথ্যে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ‘ক্যাপ্টেন ইমন’, পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু, কাইল্লা বাদল, পিন্টু, রাজেশ খান ও ওসমানের নাম পাওয়া যায়।
৩০ নম্বর ওয়ার্ড আদাবর থানা এলাকার অন্তর্ভুক্ত। এখানে চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাং কার্যক্রমে মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে ‘লেদু হাসান’-এর প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সজিব আহম্মেদ রানা, ফরিদ উদ্দিন বাবু ওরফে ‘এক্সেল বাবু’ এবং আলমগীরের নামও উঠে এসেছে। আলমগীরকে শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী হোসেন গ্রুপের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পুলিশের অনীহা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জেনেভা ক্যাম্প: মোহাম্মদপুরের অপরাধের কেন্দ্র:
মোহাম্মদপুর এলাকার বিহারি ক্যাম্প সংলগ্ন হুমায়ুন রোড এখন মাদক বিক্রির একটি বহুল আলোচিত স্পট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা বিক্রি চলে।
গত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে ওই এলাকায় গেলে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে একাধিক মাদক বিক্রেতা দাঁড়িয়ে আছেন। তারা পথচারীদের উদ্দেশে সরাসরি মাদক কেনার প্রস্তাব দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, “আমার মাল ভালো, কয় পিস লাগবে?” আবার কেউ এগিয়ে এসে নিজের পণ্যকে ভালো বলে দাবি করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রাস্তায় মাদক বিক্রিকে কেন্দ্র করে প্রায়ই রিকশার জট তৈরি হয়। কারণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশই রিকশাচালক। এখানে মূলত ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা বিক্রি হয় বলে জানা গেছে। ইয়াবা ছোট প্যাকেটে হাতে রেখে সরাসরি বিক্রি করা হয়, হেরোইন বিক্রি হয় ছোট পুড়িয়ায়, আর গাঁজা ব্যাগভর্তি করে এনে খুচরা আকারে বিক্রি করা হয়। তিন দিন ধরে এই এলাকায় সরেজমিনে একই চিত্র দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। তাদের দাবি, এটি এখন “নিয়মিত বাস্তবতা”তে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিহারি ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই মাদক বিক্রি চলে। পথচারীদের লক্ষ্য করে বিক্রেতারা সরাসরি প্রস্তাব দেন। অনেক সময় একাধিক বিক্রেতা একই ক্রেতাকে ঘিরে ধরে তাদের পণ্য নিতে চাপ দেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিহারি ক্যাম্প এলাকায় প্রায় ২৫টির মতো স্থানে মাদক কারবার চলে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব বিষয়ে পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা টেকসই নয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও স্থানীয়দের ভাষ্যে উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জেনেভা ক্যাম্প এলাকাও দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এই এলাকায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন সংঘর্ষে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। গুলিবর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণ ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর থানা লুটের ঘটনায় মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানার কিছু অস্ত্র জেনেভা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায়, যার একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিলেন ভূঁইয়া সোহেল ওরফে ‘বুনিয়া সোহেল’। পরবর্তীতে তার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ‘পিচ্চি রাজা’, ‘পার মনু’ ও ‘চুয়া সেলিম’-এর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
গত ২৯ নভেম্বর বুনিয়া সোহেলকে প্রতিপক্ষরা ধরে নিয়ে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে চিকিৎসা শেষে তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন বলে জানা যায়। বর্তমানে ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পার মনু, পিচ্চি রাজা ও চুয়া সেলিমের প্রভাব। পার মনু মূলত হেরোইন কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ‘চাপা আরিফ’ নামে পরিচিত এক মাদক সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিহারি ক্যাম্পে হেরোইন পৌঁছায় পার মনুর কাছে। এই চাপা আরিফকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে বলেও জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা জানান, ক্যাম্প এলাকায় বসবাস করা এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে গেছে। তার ভাষায়, “আমাদের সন্তানরা স্কুলে যায়, আমরা প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি। কেউ কিছু বলতেও পারে না।” স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবারিদের কারণে তারা নিয়মিত হয়রানির শিকার হন, কিন্তু মূল চক্রের নেতাদের অনেক সময় ধরা পড়ে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্প এলাকাটি এখন একটি গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসা অপরাধ কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে। তার মতে, শুধু অভিযান নয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টার্গেটেড ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান জানান, মোহাম্মদপুর এলাকায় নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে জনবল সংকট ও দ্রুত স্থান পরিবর্তনের কারণে সব সময় নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, এক এলাকায় অভিযান চলাকালীন অন্য এলাকায় আবার মাদক বিক্রি শুরু হয়ে যায়। বিষয়টি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে এবং কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম এবং অভিযানের আগেই অনেক সময় তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, ফলে কারবারিরা আগেই সরে যেতে পারে। মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থানায় হামলার ঘটনায় বড় ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনা ঘটে। ওই সময় থানায় থাকা সরকারি অস্ত্র ও গুলির বড় একটি অংশ লুট হয়ে যায় বলে জানা যায়।
সূত্র অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ৫৮টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। পাশাপাশি পুলিশের ব্যবহৃত ২ হাজার ৩৯৪টি গুলি এবং ৪ হাজার ৩৪১টি শর্টগানের গুলি লুট করা হয়। এখন পর্যন্ত এর মধ্যে মাত্র দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি অস্ত্র ও গুলির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
থানায় জমা রাখা লাইসেন্সকৃত বেসরকারি অস্ত্রও ওই সময় লুটের শিকার হয় বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুর থানার এক কর্মকর্তা জানান, থানায় থাকা ৪৬৩ জন লাইসেন্সধারীর অস্ত্র ওই সময় সেখানে জমা ছিল। অনেকের একাধিক অস্ত্র থাকায় মোট অস্ত্রের সংখ্যা আনুমানিক ৬০০-এর বেশি ছিল। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ওই ঘটনায় হাজার হাজার গুলিও খোয়া যায়। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পুলিশের তথ্য ও অনুসন্ধান:
থানা সূত্র বলছে, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে এখনো কাজ চলছে। বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, লোকাল সোর্সের মাধ্যমে অস্ত্রগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, মোহাম্মদপুর থানা এলাকার জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলেছে। তার ভাষায়, “এই থানা এলাকায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের বসবাস, যা একটি ছোট জেলার সমান। এক থেকে দেড় শ পুলিশ দিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”
লুট হওয়া অস্ত্র এখন কোথায় রয়েছে বা কার হাতে আছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় স্থানীয়ভাবে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা চলমান রয়েছে।

