সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো দেখা যায়—“ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ লাগবে, পাসপোর্ট থাকতে হবে” কিংবা “হিন্দু ও-নেগেটিভ দরকার”—এ ধরনের পোস্ট। প্রথম দৃষ্টিতে এগুলো জরুরি রক্তের প্রয়োজন বলে মনে হলেও বাস্তবে এগুলো মানব অঙ্গ, বিশেষ করে কিডনি কেনাবেচার গোপন বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ফেসবুকের বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপে প্রকাশ্যে চলছে এই অবৈধ বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে টার্গেট করে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কোটি টাকার কিডনি ব্যবসা চালাচ্ছে। এ চক্রে স্থানীয় কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের যোগসাজশ বা সহায়তার অভিযোগও উঠেছে।
আইনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই সক্রিয় বাণিজ্য:
মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন অনুযায়ী, পরিবারের বাইরে কারও সঙ্গে কিডনি বা অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই আইন উপেক্ষা করেই ফেসবুকের একাধিক ক্লোজড গ্রুপে কিডনি কেনাবেচার কার্যক্রম চলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু একটি বা দুটি নয়—অর্ধশতাধিক ক্লোজড গ্রুপে এ ধরনের কার্যক্রম সক্রিয়। এসব গ্রুপে “কিডনি ডোনার গ্রুপ”, “কিডনি বিক্রি গ্রুপ”, “কিডনি ক্রয়-বিক্রয় গ্রুপ”, “কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট”, “কিডনি ডোনার হেল্প সেন্টার”সহ বিভিন্ন নামে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কোনো কোনো গ্রুপে সদস্য সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। এমনকি ওপেন গ্রুপেও প্রতিদিন শত শত বিজ্ঞাপন পোস্ট হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে সাংকেতিক ভাষায়। “ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ” বা “ও-নেগেটিভ দরকার”—এ ধরনের রক্তের চাহিদার আড়ালে মূলত কিডনি কেনাবেচার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। দরিদ্র মানুষকে সহজেই প্রলোভনে ফেলতেই এই কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, একজন সুস্থ ব্যক্তির কিডনি নিতে গ্রহীতাকে খরচ করতে হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হলে এই দাম প্রযোজ্য। আর নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে দাম এক কোটি টাকারও বেশি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন কিডনি দাতারা। তাদের হাতে আসে মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এর বিনিময়ে তারা আজীবন শারীরিক ঝুঁকি ও পঙ্গুত্বের সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকেন। অর্থের লোভে অসহায় মানুষ নিজের অঙ্গ হারাচ্ছেন, আর এর বিপরীতে একটি অসাধু চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
ছায়ার আড়ালে কিডনি পাচার চক্র: তিন স্তরের সুসংগঠিত অপরাধ:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্রের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এই চক্রটি সুসংগঠিতভাবে তিনটি স্তরে বিভক্ত হয়ে কাজ করে, যার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গোপনীয় ও পরিকল্পিত।
প্রথম স্তর:
চক্রের প্রথম ধাপে কাজ করে স্থানীয় ও ফেসবুকভিত্তিক মাঠকর্মীরা, যাদের বলা হয় ‘এজেন্ট’। তাদের প্রধান কাজ হলো দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও অসহায় মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো। তারা দাতাদের পাকিস্তানে থাকা-খাওয়া, হাতখরচ এবং পরিবারের দেখভালের মতো স্বপ্ন দেখায়। প্রতিটি কিডনি দাতার জন্য এই এজেন্টরা প্রায় তিন লাখ টাকা কমিশন পায়। রক্তের গ্রুপ ‘নেগেটিভ’ হলে কমিশন আরও বেড়ে যায়।
তদন্তে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। এদের বড় অংশ উত্তরবঙ্গের, বিশেষ করে জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ করে। যোগাযোগের জন্য তারা শুধু হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে এবং ফোন নম্বর প্রায়ই বন্ধ রাখে।
দ্বিতীয় স্তর:
চক্রের দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ‘ফিক্সার্স’। তাদের কাজ হলো দাতা ও গ্রহীতার পাসপোর্ট, ভিসা এবং টিকিট প্রক্রিয়াকরণ। একই সঙ্গে করাচি পাঠানোর সব ব্যবস্থা তারা নিয়ন্ত্রণ করে। আগে ভারত—দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের বিভিন্ন ক্লিনিকে এই ট্রান্সপ্লান্ট হতো। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভিসা জটিলতায় ভারতের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চক্রটি পাকিস্তানের করাচিকে নতুন গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
তথ্য অনুযায়ী, তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইটে দাতাদের করাচি পাঠায়। দাতারা যেন পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে না পারে, সে জন্য তাদের ও পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রেখে দেওয়া হয়। কেউ কথা না শুনলে সেই নথি আটকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। এই স্তরের দালালরা প্রতিটি কিডনির জন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে।
তৃতীয় স্তর:
চক্রের তৃতীয় স্তর পরিচালনা করে পাকিস্তানভিত্তিক সদস্যরা, যাদের বলা হয় ‘রানার্স’। তারা করাচি বিমানবন্দরে দাতাদের রিসিভ করে নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যায় এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এই স্থানীয় নেটওয়ার্কের সদস্যরা প্রতিটি দাতার জন্য প্রায় এক লাখ টাকা কমিশন পায়।
সবচেয়ে বড় অর্থ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে চক্রের মূল হোতা বা ‘কিংপিন’। অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশে থাকা ধনাঢ্য রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কিডনি সংগ্রহের ব্যবস্থা করে। তারা নির্ধারণ করে কোন ব্লাড গ্রুপের কত কিডনি প্রয়োজন। এরপর বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেটওয়ার্ক সেই অনুযায়ী দাতা সংগ্রহ করে। প্রতিটি কিডনি বিক্রিতে এই আন্তর্জাতিক চক্র ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে। এর বড় অংশই যায় বিদেশে অবস্থানরত নিয়ন্ত্রকদের হাতে।
তদন্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো— এই কালোবাজারে বিক্রি হওয়া কিডনির বড় অংশই বাংলাদেশি দাতাদের শরীর থেকে আসছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী নাম হিসেবে নুরুজ্জামানের কথা বিভিন্ন গ্রেপ্তার আসামির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। এজেন্টদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে হলেও সরাসরি দেখা যায় না বলে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন জানিয়েছেন, কিডনি বিক্রি চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের নজরদারি নিয়মিতভাবে চলছে। তার মতে, কেউ এই ধরনের চক্রের শিকার হলে অভিযোগ জানালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সাইবার ইউনিট ২৪ ঘণ্টা অনলাইন কার্যক্রম মনিটরিং করছে এবং কোনো অপতৎপরতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এই অবৈধ বাণিজ্যে একটি কিডনির জন্য গ্রহীতাকে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়। অন্যদিকে দাতার হাতে পৌঁছে মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। অর্থের বড় অংশ চলে যায় সিন্ডিকেটের হাতে। ফলে দরিদ্র দাতারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শারীরিক জটিলতার মুখে পড়ছেন। অর্থের প্রলোভন, প্রতারণা ও দারিদ্র্যের কারণে তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছেন।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-এর একটি ইউনিট কিডনি পাচার চক্র নিয়ে কাজ করছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত এগোয় না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূল হোতাদের নাম প্রকাশ করে না। আবার এজাহারে যাদের নাম থাকে, বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তদন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যেও একসময় আগ্রহ কমে যায়। ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, তাদের তথ্য অনুযায়ী এই চক্রের কার্যক্রমে প্রশাসনিক সহযোগিতা রয়েছে, যা পুরো অপরাধচক্রকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চলতি বছরের ২৬ মার্চ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানে পাচারের উদ্দেশ্যে এক কিডনিদাতা যুবককে নিয়ে আসে চক্রের এজেন্টরা।
চেক-ইন কাউন্টারে নথিপত্র যাচাইয়ের সময় সন্দেহ তৈরি হলে হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) হালিম। ইউনিফর্ম ছাড়া থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে ওই যুবকের ভাই পরিচয় দিয়ে বোর্ডিং পাস ইস্যু করতে চাপ দেন। তার পরিচয়পত্র দেখানোর পর কর্মকর্তারা বোর্ডিং পাস দেন, তবে বিষয়টি নথিভুক্ত করে রাখেন।
পরে গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক জানান, এসআই হালিম তার ভাই নন এবং আগে কখনোই তাকে দেখেননি। তদন্তে জানা যায়, তিনি মিথ্যা পরিচয় দিয়ে পাচারকারীদের সহায়তা করেছেন। এরপর ইমিগ্রেশন পুলিশ বিষয়টি বুঝতে পেরে যুবককে পাকিস্তানে যেতে বাধা দেয় এবং চক্রের এক এজেন্টকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার পর বিমানবন্দর থানায় মামলা হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই জাহিদ। তবে শুরুতে তিনি ভিক্টিমকেই সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত চলাকালে এসআই জাহিদ জানান, রিমান্ডে আসামিরা মূল হোতাদের নাম প্রকাশ করেনি। তবে অনুসন্ধান বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নুরুজ্জামান নামের একজনকে মূল সমন্বয়কারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন।
সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় হলো, মামলার এজাহারে নাম থাকা সত্ত্বেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এসআই হালিমকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। বিমানবন্দরে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অনুসন্ধান বলছে, কিডনি পাচার চক্র শুধু একটি অপরাধী নেটওয়ার্ক নয়, বরং এর শিকড় অনেক গভীরে বিস্তৃত। তদন্তের ধীরগতি, মূল হোতাদের আড়াল থাকা এবং প্রশাসনিক সহযোগিতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এই চক্রকে নিয়ন্ত্রণে আনা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্র নিয়ে অনুসন্ধানে নতুন ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। করাচির ছোট ক্লিনিক থেকে শুরু করে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কে কীভাবে অবৈধ অঙ্গ বাণিজ্যের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তার একটি চিত্র পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি কিডনি দাতাদের বিভিন্ন মেডিক্যাল টেস্ট করানোর জন্য ঢাকার কয়েকটি পরিচিত প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু), ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিডনি পাচার বা অবৈধ প্রতিস্থাপনের সরাসরি কোনো যোগসাজশ পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কেবলমাত্র দাতার শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষাই সম্পন্ন করে থাকে।
গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের কয়েকজন সদস্যের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে আরও গুরুতর তথ্য। তাদের দাবি অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী নিকট আত্মীয় ছাড়া কিডনি প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ হলেও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে অচেনা দাতাকে আত্মীয় হিসেবে দেখিয়ে অস্ত্রোপচারের ঘটনা ঘটেছে। একজন আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, নকল নথি ব্যবহার করে দাতা ও রোগীকে আত্মীয় হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে এ হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মীর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, নথি যাচাইয়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি এই জালিয়াতি ঘটিয়েছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া কিডনির বড় অংশ পাকিস্তানের করাচিতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নাম উঠে এসেছে, যেমন— ডা. জিয়াউদ্দিন হাসপাতাল, নিউ হরাইজন কেয়ার হাসপাতাল, আদিল হাসপাতাল, বেহরিয়া ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল এবং ইসলামাবাদ ফারুক ইনকিলাব হাসপাতাল। গ্রেপ্তার আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তা চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা ভুয়া ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) সংগ্রহ করে দেন।
চক্রটি দাতা ও গ্রহীতাকে ভুয়া আত্মীয় হিসেবে উপস্থাপন করে আইনি জটিলতা এড়ানোর চেষ্টা করে। লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডির কিছু ছোট ক্লিনিককে তারা ট্রানজিট বা অস্থায়ী অবস্থান হিসেবে ব্যবহার করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, এই ধরনের অপরাধ রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকায় এই চক্রের প্রভাব বেশি হওয়ায় সেখানে প্রচার ও প্রতিরোধ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য ও প্রতারণার শিকার হয়ে যাতে কেউ অঙ্গ হারানোর মতো ভয়াবহ ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
দেশে কিডনি পাচার চক্র নিয়ে একাধিক মামলা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ফল আনতে পারছে না। পুলিশের ফাইলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে, ফলে চক্রের মূল সদস্যরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
২০২৪ সালের মে মাসে নেত্রকোনার রবিন নামে এক যুবককে জোরপূর্বক ভারতে নিয়ে গিয়ে কিডনি দিতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। তিনি পরে ঢাকার ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন। এজাহারে একাধিক আসামির নাম থাকলেও তদন্তে তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরে আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে পুলিশ জানায়, আসামিদের সঠিক নাম-ঠিকানা শনাক্ত করা যায়নি। একই সঙ্গে বলা হয়, অভিযুক্তদের একটি অংশ ভারতে অবস্থান করছে, ফলে তদন্ত এগোতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই কারণ দেখিয়ে কিছু আসামিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
২০২২ সালে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় র্যাবের অভিযানে পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়। তখন জানানো হয়েছিল, রাসেল নামে একজন এই চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পরে ভাটারা থানায় মামলা হয় এবং তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিন্তু সেই মামলার ফলাফলও প্রায় একই। চার্জশিটে মূল অভিযুক্ত রাসেলকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়, কারণ হিসেবে বলা হয় তার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। চার্জশিটে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুপস্থিত ছিল। চক্রটি কখন থেকে সক্রিয়, কতজন দাতা ব্যবহার করা হয়েছে বা কাদের কাছে কিডনি বিক্রি হয়েছে— এসব বিষয় উল্লেখই করা হয়নি।
ডিএমপির একটি থানার তদন্ত কর্মকর্তা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানান কিডনি পাচার চক্রকে ধরা অত্যন্ত কঠিন। তার মতে, এই চক্র ‘স্লিপার সেল’-এর মতো কাজ করে। তারা একাধিক স্তরে বিভক্ত এবং এক স্তরের সদস্য অন্য স্তরের সদস্যকে চেনে না। যোগাযোগে ব্যবহার করা হয় বিদেশি নম্বর, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। ফলে কোনো সদস্য ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক তাৎক্ষণিকভাবে গা ঢাকা দেয়। পরে তারা নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে আবার সক্রিয় হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার মতে, দাতাদের সঙ্গে শুরুতে যোগাযোগ থাকলেও পরে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে চক্রের কেন্দ্রীয় অংশ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিল কাঠামো ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অধিকাংশ মামলায় তদন্ত এগোতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, কিডনি পাচার চক্রের বিষয়ে সংস্থাটির নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও মনিটরিং করা হচ্ছে। তার ভাষায়, অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দালাল চক্র এখন সরাসরি ‘কিডনি’ শব্দ ব্যবহার করছে না। এর পরিবর্তে তারা ‘কে’, ‘ও পজিটিভ’ বা ‘ও নেগেটিভ’-এর মতো রক্তের গ্রুপভিত্তিক কোড ওয়ার্ড ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল ও কভার ছবিতে ধর্মীয় বাণী বা পরিচিত হাসপাতালের লোগো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে।
চক্রের কার্যপ্রণালী জানতে এক প্রতিবেদক ছদ্মবেশে একজন কিডনি দাতা হিসেবে যোগাযোগ করেন। ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের পরপরই তাকে +৯২ নম্বর (পাকিস্তানের কান্ট্রি কোড) থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হয়। প্রাথমিক কথাবার্তার পর এজেন্ট জানায়, একটি কিডনির বিনিময়ে চার লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। তবে পাসপোর্ট না থাকলে দালালের মাধ্যমে ব্যবস্থা করে ২০ হাজার টাকা কেটে চূড়ান্তভাবে চার লাখ টাকা প্রদান করা হবে। চক্রটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো অপারেশন হবে পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে যাওয়া, থাকা ও খাওয়ার খরচ তারা বহন করবে। এমনকি অপারেশনের আগেই ঢাকায় ভুক্তভোগীর পরিবারের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়।
টাকা ও প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানতে গেলে প্রতিবেদকের প্রশ্নে এজেন্টের আচরণ বদলে যায়। কিছুক্ষণ পর সে দাবি করে, “অতিরিক্ত ওজনের কারণে ডাক্তাররা কিডনি নিতে চান না”—এ কথা বলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে ওই নম্বরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অর্থনৈতিক চাপ কীভাবে মানুষকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়, তার বাস্তব উদাহরণ পাওয়া গেছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ২৪ বছর বয়সী আরিফুল ইসলামের ঘটনায়। চলতি বছরের মার্চে ঋণ থেকে মুক্তি পেতে তিনি পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি হন। এক এজেন্ট তাকে ঢাকায় এনে ‘নোয়াখালী হোটেলে’ রাখে, যেখানে আগে থেকেই রুম বুক করা ছিল এবং সব খরচ পরিশোধ করা হয়। সেখানে গোপনে টিস্যু টেস্ট, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ সব মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। দুই দিন পর তাকে জানানো হয়, অপারেশন হবে পাকিস্তানে এবং ভিসাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
ভিসা হওয়ার পর তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষার সময় তিনি এজেন্টদের একটি কথোপকথন শুনে ফেলেন, যেখানে বলা হয় অপারেশনের পর তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। এই তথ্য জানার পর আরিফুল বুঝতে পারেন তিনি বড় ধরনের পাচার চক্রের ফাঁদে পড়েছেন। তিনি দ্রুত ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানান। পুলিশের সহায়তায় শেষ মুহূর্তে তিনি কিডনি পাচারের হাত থেকে রক্ষা পান এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত থানায় অভিযোগ করা, প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং বিদেশে ঘটলে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যন্ত জরুরি। আরিফুলের মতো প্রতিদিনই শত শত তরুণ-তরুণী অর্থনৈতিক প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে কিডনি দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে আর্থিক সংকট, প্রতারণা এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের প্রভাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, মূলত তিনটি কারণে মানুষ কিডনি বিক্রির মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এগুলো হলো অর্থনৈতিক অনটন, মাদকাসক্তির ব্যয় মেটানো এবং অপরাধী চক্রের প্রতারণা।
তার মতে, অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়ায় নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে অঙ্গ না পেলে অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা অভাবী মানুষকে টার্গেট করে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অঙ্গ বাণিজ্যে যুক্ত করে, যা সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতির জন্য বড় বাধা।
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকায় প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে মানুষ কিডনি হারানোর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি জটিলতা সম্পর্কে সচেতন হয়। তার মতে, দারিদ্র্য বা প্রতারণার কারণে কেউ যেন অঙ্গ হারিয়ে স্থায়ী ক্ষতির শিকার না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, কিডনি পাচার চক্রের বিষয়ে সংস্থাটির সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। তার ভাষায়, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, কিডনি বা অন্য কোনো অঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র নিকটাত্মীয়দের মধ্যে স্বেচ্ছায় ও নিঃস্বার্থভাবে অঙ্গ দান বৈধ। এ ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনে খরচ প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে এক থেকে তিন মাস।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালাল চক্রের মূল লক্ষ্য থাকে দরিদ্র মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করা। এই পুরো প্রক্রিয়া ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’-এর আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। দাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সীমান্ত পার করে বিদেশে অপারেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই মানবপাচারের আওতায় পড়ে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, আইন অনুযায়ী অঙ্গ কেনাবেচা, প্রলোভন, বিজ্ঞাপন বা দালালি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। তিনি আরও বলেন, মানবপাচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
আইনজীবী ইশরাত হাসান ভুক্তভোগীদের দ্রুত থানায় অভিযোগ, চিকিৎসা গ্রহণ এবং সব প্রমাণ সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। বিদেশে ঘটলে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট
সিভি/এম

