বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রকৃতি অনেক সময়ই হাওরের অসহায় কৃষকদের প্রতি সহনশীল ছিল। আগের মতো প্রতি তিন বছর পরপর বড় ধরনের বন্যায় ফসল ডুবে যাওয়ার ঘটনা আর নিয়মিত হয়নি। ২০১৭ সালে সর্বশেষ বড় অকাল বন্যায় হাওর তলিয়ে যায়। আট বছর বিরতির পর এবার আবারও সেই ভয়াবহ চিত্রই দেখা গেল হাওরাঞ্চলে।
গত কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধান। কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে ফসল রক্ষার বাঁধ। শত চেষ্টা করেও পানি ঠেকানো যায়নি। কৃষকদের চোখের সামনে একে একে নষ্ট হয়ে গেছে বছরের পরিশ্রমের ফল।
হাওরাঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। এখানে বোরো ধানই জীবিকার প্রধান উৎস। একমাত্র ফসল ভালোভাবে ঘরে তুলতে পারলেই কৃষকের সংসারে স্বস্তি আসে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। কৃষকেরা তাদের মোট ফসলের প্রায় ২০ শতাংশও ঘরে তুলতে পারেননি।
বৈশাখের শুরু থেকেই সাত জেলায় ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়। কিন্তু এবার শুরুতেই আগাম বৃষ্টির বাধায় সেই কাজ ব্যাহত হয়। উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে হাওরে প্রবেশ করে। ফলে অনেক কৃষক ধান পাকার পরও তা কাটতে পারেননি। যারা কেটেছেন, তারাও শুকিয়ে ঘরে তুলতে পারেননি।
ফসল হারিয়ে হাওরজুড়ে এখন নীরব কান্না, হতাশা আর ক্ষোভ। জীবিকার একমাত্র ভরসা হারিয়ে অনেক পরিবার দিশেহারা। কীভাবে বছর পার হবে—এই প্রশ্নই এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড়। তবুও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন তারা।
হাওর এলাকায় দুই ধরনের সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। একদিকে মহাজনদের কাছ থেকে কৃষি ও মাছ ধরার নৌকার জন্য উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া, অন্যদিকে ব্যাংকের কৃষি ঋণ। এবারও অনেক কৃষক ধার-দেনা করে চাষাবাদে নেমেছিলেন। কিন্তু সেই বিনিয়োগ চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তাদের সামনে ঋণের বোঝা, খাদ্য সংকট এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা। ফসল না হওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্যসংকটও দেখা দেবে। কারণ খড় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সামনে খড়ের দাম ধানের চেয়েও বেশি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় পুরো হাওরের ফসল তলিয়ে গিয়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল, যার প্রভাব জাতীয় বাজারেও পড়ে চালের দাম বেড়ে যায়। এবারও সেই ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠছে—প্রতি বছর কেন হাওরের কৃষকদের এমন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়? এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই কেন? বাস্তবতা বলছে, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-নদী দখল, খননের অভাব এবং জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
বৃষ্টি বাড়লেই পানি দ্রুত নেমে এসে হাওরে ঢুকে পড়ে। খাল ও নালা ভরাট থাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ফসল ডুবে যায়। অন্যদিকে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণেও প্রতিবছর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। টেকসই বাঁধ না থাকায় অল্প পানির চাপেই তা ভেঙে যায়।
হাওরের নিচু জমিতে পানি জমে থাকলেও দ্রুত নিষ্কাশনের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ফলে কৃষকের ক্ষতির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও কার্যকর বিচার বা স্থায়ী সমাধানের উদাহরণ খুব কমই দেখা গেছে। তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয়নি।
হাওরাঞ্চল জুড়ে প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর এলাকায় ৩৭৩টি হাওর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাওর সুনামগঞ্জে। এছাড়া সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও বিস্তৃত হাওর রয়েছে। হাওর উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠান গঠন করা হলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের চেয়ে প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রমই বেশি দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যে সহায়তার ঘোষণা এসেছে, তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে যারা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কৃষিকাজ করেছেন, তাদের জন্য আলাদা সহায়তার দাবি উঠছে। হাওরের কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু দুর্যোগকালীন সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। খাল-নদী খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে এই সংকটের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে না।
কৃষকদের জন্য মৌসুম শুরুর আগেই আর্থিক সহায়তা, রেশন ব্যবস্থা এবং ঋণ পুনর্বিন্যাসের মতো উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠছে। কারণ হাওরের কৃষকরা শুধু প্রকৃতির সঙ্গেই নয়, নীতিগত অব্যবস্থাপনার সঙ্গেও লড়াই করে টিকে আছেন।

