দেশজুড়ে খুন, জখম, অপহরণ ও ডাকাতিসহ সহিংস অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এসব ঘটনা শুধু পেশাদার অপরাধী বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধ, অস্থিরতা এবং কোন্দলের কারণেও নৃশংস ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। এতে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৪৪৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ২৬৮ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়েও রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুন, অপহরণ, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যে মানসিক চাপ ও বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে অপরাধ আরও বাড়তে পারে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা মঙ্গলবার এক গণমাধ্যমকে বলেন, সময়ের সঙ্গে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশও বারবার হামলার শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশ কেন হামলার শিকার হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করা দরকার। অতীতের তুলনায় এখন হামলার ঘটনা অনেক বেড়েছে। তাই কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপরাধীদের মধ্যে এখন আগ্রাসী প্রবণতা বেড়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকাশ্যে খুন ও হামলার ঘটনাও বাড়ছে। ব্যস্ত সড়ক ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকাতেও ছিনতাই ও সহিংসতা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা শিথিলতা অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। তিনি বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এতে ভূমিকা রাখছে। তবে বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পুলিশকে পেশাদারভাবে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে এবং আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পুলিশ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে। তিনি বলেন, যেখানেই অপরাধ ঘটছে, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক বহু আলোচিত মামলায় দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তার সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
পাঁচ মাসে ১ হাজার ৪৪৪ খুন:
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮০টি এবং মে মাসে ৩১০টি খুনের ঘটনা ঘটে। জুন মাসের শুরুতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নারী ও শিশু নির্যাতন ৭ হাজার ৯১০টি:
এই পাঁচ মাসে ৭ হাজার ৯১০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১টি, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫টি ঘটনা ঘটে। এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি এবং মে মাসে ১ হাজার ৯৫২টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়।
অপহরণ ৪৩৭টি:
এ সময় মোট ৪৩৭টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। জানুয়ারিতে ৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৪টি, মার্চে ১০২টি, এপ্রিলে ৯৪টি এবং মে মাসে ৯০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
পুলিশের ওপর হামলা ২৬৮টি:
পাঁচ মাসে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে ২৬৮টি। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি করে, মার্চে ৬৩টি, এপ্রিলে ৬৬টি এবং মে মাসে ৫৫টি হামলার ঘটনা ঘটে। গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে একটি ছিনতাইকারী চক্রের আস্তানায় অভিযানে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। এর আগে ১১ জুন শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইকারীদের ধাওয়ার সময় দুই পুলিশ সদস্য ছুরিকাঘাতে আহত হন।
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৬ জন। একই সময়ে নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৯ জন। এর মধ্যে গণধর্ষণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় একাধিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। ২০ জুন তেজগাঁওয়ে চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইয়ের সময় এক পরীক্ষার্থী ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। ১৯ জুন মোহাম্মদপুরে এক রাজনৈতিক কর্মীর ওপর হামলা হয়। ১৮ জুন কদমতলীতে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৭ জুন বাড্ডায় খাল থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার হয়। ১৬ জুন কেরানীগঞ্জে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে একজন নিহত হন।
১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়। ১২ জুন রাজধানীতে এক শীর্ষ অপরাধী গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান। পুলিশ বলছে, এসব ঘটনার পেছনে আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধ চক্রের দ্বন্দ্ব রয়েছে।
৮ জুন মৌচাকে প্রকাশ্যে এক রাজনৈতিক কর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। বরগুনায় খাল থেকে মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার এবং আরেক যুবককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাও আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের ধারণা, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এসব ঘটনা ঘটেছে।

