Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice বুধ, জুলাই 1, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » হোলি আর্টিজান: যে রাতের স্মৃতি আজও নীরবে কাঁদায়
    অপরাধ

    হোলি আর্টিজান: যে রাতের স্মৃতি আজও নীরবে কাঁদায়

    মনিরুজ্জামানজুলাই 1, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    ২০১৬ সালের ১ জুলাই। ঢাকার গুলশান লেকপাড়ের ৭৯ নম্বর সড়কের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারি। বাইরে থেকে দেখলে তখন এটি ছিল একটি স্বাভাবিক রেস্তোরাঁ। বিদেশি ও দেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে ইফতারের পরের সময়টিও ছিল সাধারণ দিনের মতোই।

    কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই স্বাভাবিকতা ভেঙে যায়। ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকে পড়ে। শুরু হয় জিম্মি সংকট। মুহূর্তেই পুরো এলাকা অস্থির হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র‍্যাব, সোয়াট এবং বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। শুরু হয় দীর্ঘ ও উদ্বেগময় অপেক্ষা।

    জিম্মিদের উদ্ধারের প্রথম চেষ্টা চলাকালে হামলাকারীদের বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। পরে তাঁরা দুজনই মারা যান। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন।

    রাতভর গুলশানের রাস্তায় অপেক্ষায় ছিলেন জিম্মিদের স্বজনেরা। ভেতরে থাকা প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন কি না, সেই অনিশ্চয়তায় কেটেছে দীর্ঘ সময়। পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন কমান্ডোরা। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়।

    অভিযান শেষে উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে জীবিত অবস্থায়। তবে ভেতরে পাওয়া যায় ২০ জন জিম্মির মরদেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক। সব মিলিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ জনে।

    গভীর উৎকণ্ঠার রাত শেষে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি জঙ্গিমুক্ত হয়, যা দেখা যায় ২০১৬ সালের ২ জুলাই ভোরে।

    আজ ১ জুলাই, সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের হিসাবে এক দশক পেরিয়ে গেছে কিন্তু সেই রাতের আতঙ্ক, স্বজন হারানোর আর্তনাদ, বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং শিক্ষিত-সচ্ছল পরিবারের তরুণদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে হোলি আর্টিজান এখনো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত।

    হোলি আর্টিজান: সেই রাতে যারা প্রাণ হারান

    হোলি আর্টিজান বেকারি হামলায় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ২২ জন হিসেবে বারবার উল্লেখ করা হয় কিন্তু এক দশক পর সেই তালিকার দিকে ফিরে তাকালে শুধু সংখ্যা দিয়ে এই ক্ষতির গভীরতা বোঝা যায় না। সেই রাতে প্রাণ হারানো প্রতিটি মানুষই ছিলেন আলাদা জীবন, স্বপ্ন ও পরিচয়ের প্রতিনিধি। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির এবং ইশরাত আখন্দ। ছিলেন ভারতের তরুণী তারিশি জৈন।

    ইতালির নাগরিকদের মধ্যে নিহত হন ক্লাউদিয়া কাপেল্লি, ভিনচেনসো দালেস্ত্রো, মার্কো তোন্দাৎ, নাদিয়া বেনেদিত্তি, সিমোনা মন্তি, ক্রিস্তিয়ান রসি, মারিয়া রিবোলি, আদেলে পুলিজি এবং ক্লাউদিয়া দান্তোনা। জাপানের নাগরিকদের মধ্যে ছিলেন ওকামুরা মাকাতো, কোয়ো ওগাসাওয়ারা, হাসিমাতো হিদেকো, তানাকা হিরোশি, সাকাই ইউকু, শিমুধুইরা রুই এবং কুরুসাকি নুবুহিরি।

    জানা যায়, সাত জাপানি নাগরিক বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শোকই নয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক আস্থার ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা তৈরি করে। অন্যদিকে, ইতালীয় নাগরিকদের মৃত্যু ইউরোপীয় মহলে গভীর শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে দেয়। গুলশানের মতো কূটনৈতিক ও নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত এলাকায় এমন হামলা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবমূর্তিকেও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

    তদন্ত ও জীবিতদের বয়ান অনুযায়ী, হামলাকারীরা জিম্মিদের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। জানা যায়, বাংলাদেশি মুসলমানদের কেউ কেউ কোরআন তিলাওয়াত করতে পারায় বেঁচে যান। আর বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করা হয় গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। একটি পরিকল্পিত ও নির্মম হামলার সেই রাত আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

    আইএসের দাবি বনাম পুলিশের অবস্থান: নব্য জেএমবি বিতর্ক

    হোলি আর্টিজান বেকারি হামলার সময়ই ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ঘটনার দায় স্বীকার করে। আইএসের কথিত প্রচারমাধ্যম ‘আমাক নিউজ’-এর বরাতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ জানায়, ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় আইএসের সদস্যরা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করেছে। ওই রাতেই আমাক নিউজ রেস্তোরাঁর ভেতরের রক্তাক্ত অবস্থার কিছু ছবি প্রকাশ করে। পরে ভোরের দিকে সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

    হোলি আর্টিজান হামলার আগের প্রায় দেড় বছরে দেশে উগ্রগোষ্ঠী-সংশ্লিষ্ট অন্তত ২৭টি হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটে। এসব ঘটনায় মোট ২৮ জন নিহত হন। লক্ষ্যবস্তু ছিল ব্লগার, লেখক-প্রকাশক, শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য, হিন্দু পুরোহিত, বিদেশি নাগরিক, খ্রিষ্টান এবং ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক স্থানের অনুসারীরা। এর মধ্যে আইএস তাদের অনলাইন প্রচারমাধ্যম ‘আমাক নিউজ’-এ ১৭টি ঘটনার দায় স্বীকার করেছিল বলে জানা যায়।

    তবে তৎকালীন সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলার পেছনে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস নয়, বরং দেশীয় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো দায়ী। বিশেষ করে নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামকে এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে নব্য জেএমবিকে আইএস মতাদর্শী এবং আনসার আল ইসলামকে আল-কায়েদা মতাদর্শী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।

    ‘নব্য জেএমবি’ নামটি মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া পরিচয়। সংগঠনটির সদস্যরা নিজেরা কখনো এই নাম ব্যবহার করেনি; তারা নিজেদের আইএসের অংশ হিসেবে পরিচয় দিত। সে সময় সরকার আইএসের সরাসরি উপস্থিতি স্বীকার না করায় এবং হামলাকারীদের একটি অংশ নিষিদ্ধ জেএমবি থেকে আসায় পুলিশ এ গোষ্ঠীকে ‘নিও জেএমবি’ বা নব্য জেএমবি নামে চিহ্নিত করে।

    তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, হোলি আর্টিজান হামলার পেছনে আইএস মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি। কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করে নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতা প্রদর্শন, বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে নৃশংসতা দেখানো এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়া।

    পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি: কয়েক মাসের ছক

    হোলি আর্টিজান বেকারি হামলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ঘটনার কয়েক মাস আগে থেকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আইএস মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ একটি গোষ্ঠীর কথিত ‘শুরা কমিটি’ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া এলাকায় বৈঠক করে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।

    ওই বৈঠকে বিদেশিদের লক্ষ্য করে হামলার প্রস্তাব দেন এই গোষ্ঠীর অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হামলার মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পান তামিম। সহ-সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান। লজিস্টিক সহায়তায় যুক্ত হন বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট, তানভীর কাদেরীসহ আরও কয়েকজন।

    পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পাঁচ তরুণকে হামলাকারী দল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, যাদের তারা ‘ইসাবা’ বা আক্রমণকারী দল হিসেবে অভিহিত করত। এই দলে ছিলেন ঢাকার সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের তিন তরুণ—রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম এবং মীর সামেহ মোবাশ্বের।

    রোহান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। মীর সামেহ মোবাশ্বের স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল সম্পন্ন করেন। নিবরাস ইসলাম ঢাকার টার্কিশ হোপ স্কুল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন বগুড়ার খায়রুল ইসলাম পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল।

    হোলি আর্টিজান হামলা স্পষ্ট করে দেয়, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সচ্ছল পরিবার কিংবা নগরজীবনের সুবিধা—কোনোটিই এককভাবে উগ্রবাদী মতাদর্শ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে না। বরং অনলাইন প্রভাব, গোপন নেটওয়ার্ক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মতাদর্শিক প্ররোচনা মিলেই নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

    হিজরতের নামে বাড়ি ছাড়া: নিখোঁজ থেকে হামলাকারী

    হোলি আর্টিজান বেকারি হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ ঘটনার অনেক আগেই ‘হিজরত’-এর নামে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তাঁদের পরিবার তখন থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা নিখোঁজ ছিলেন বলেই প্রথমে ধারণা করা হয়।

    রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। মীর সামেহ মোবাশ্বের ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বনানীর বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। খায়রুল ইসলাম পায়েলও দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন বলে পরে তাঁর পরিবার জানায়। এই নিখোঁজ থাকার ঘটনাগুলো পরবর্তীতে হোলি আর্টিজান পরবর্তী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, পরিবারগুলো প্রথমে সন্তানদের নিখোঁজ হিসেবে খুঁজতে থাকে; পরে জানা যায়, তারা জড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায়।

    এই ঘটনা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন সতর্কবার্তা তৈরি করে। তরুণদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অনলাইন নির্ভরতা, গোপন যোগাযোগ বা ধর্মীয় ভাষ্যের আড়ালে উগ্র মতাদর্শে জড়িয়ে পড়া—এসবকে এখন আর শুধুই ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে উঠে আসে আলোচনায়।

    বাড়ি ছাড়ার পর এসব তরুণকে বিভিন্ন আস্তানায় রাখা হয় ঝিনাইদহ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও পাবনার এলাকায়। তদন্তে জানা যায়, শুধু মতাদর্শিক প্রশিক্ষণই নয়, বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি এবং শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলায়ও তাদের ব্যবহার করা হয়। এতে তাদের মধ্যে সহিংসতার অভ্যাস তৈরি করা হচ্ছিল বলে মনে করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

    ২০১৬ সালের মে মাসে নির্বাচিত পাঁচজনকে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ফুলছড়ি চরে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে তাদের অস্ত্র চালানো এবং বোমা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণ, আশ্রয়, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তার পুরো ব্যবস্থাপনায় নব্য জেএমবির কয়েকজন সংগঠক যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তাদের ঢাকায় এনে হামলার জন্য প্রস্তুত করা হয়।

    হোলি আর্টিজান কেন ছিল লক্ষ্যবস্তু:

    তদন্তে উঠে আসে, আইএস মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল গুলশান ও বনানী এলাকার এমন স্থান, যেখানে বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি বেশি এবং নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে কম। সেই উদ্দেশ্যেই তারা একাধিক স্থান পর্যবেক্ষণ করে।

    জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে গুলশান এলাকার বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁ নজরদারিতে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় হোলি আর্টিজান বেকারি। বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় এই রেস্তোরাঁটি শুক্রবার সন্ধ্যায় বিশেষভাবে ব্যস্ত থাকত, যা হামলার সময় বেশি সংখ্যক মানুষকে একত্রে পাওয়া সম্ভব করে তুলত।

    তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, রেস্তোরাঁর পেছনে লেক থাকায় হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচল ও কৌশলগত অবস্থান কিছুটা সীমিত হতে পারে—এ বিষয়টিও হামলাকারীরা বিবেচনায় নিয়েছিল। ঘটনাস্থল চূড়ান্ত করা হয় হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। তবে সরাসরি হামলাকারীদের বিষয়টি জানানো হয় মাত্র তিন-চার দিন আগে। এ সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয় সম্পন্ন করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।

    ২৭, ২৮ ও ২৯ জুন একাধিক দফায় রেকি বা পূর্বপর্যবেক্ষণ চালানো হয়। রোহান, নিবরাস ও মীর সামেহ মোবাশ্বের আগে থেকেই রেস্তোরাঁটি সম্পর্কে পরিচিত ছিলেন। পরে তামিম আহমেদ চৌধুরী হামলাকারীদের নিয়ে বৈঠক করেন এবং রোহান ইবনে ইমতিয়াজকে আক্রমণকারী দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    বসুন্ধরার আস্তানা থেকে গুলশানের হামলা:

    হোলি আর্টিজান বেকারি হামলার আগে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, জুনের শুরু থেকে ধাপে ধাপে সেখানে অবস্থান নেন তানভীর কাদেরী, বাশারুজ্জামান, নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান, তামিম আহমেদ চৌধুরী এবং পাঁচ হামলাকারী। ওই ফ্ল্যাটে অস্ত্র, গুলি, চাপাতি এবং হাতে তৈরি বোমা রাখা হয় বলে জানা যায়। এটিই ছিল হামলার আগে তাদের প্রধান প্রস্তুতি কেন্দ্র।

    হামলার দিন ১ জুলাই বিকেলের দিকে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পাঁচ হামলাকারী বসুন্ধরার ওই বাসা থেকে বের হন। কিছুটা পথ রিকশায় এবং কিছুটা পথ হেঁটে তারা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে পৌঁছান। ইফতারের পরপরই শুরু হয় হামলা। ভেতরে থাকা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করা হয়। রাতের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে একে একে ২০ জনকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।

    বাইরে তখন পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। গুলশানের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরাও সেখানে জড়ো হন। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের নজর তখন পুরোপুরি ঢাকার দিকে। ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে—কতজন জিম্মি আছেন, কতজন বেঁচে আছেন বা পরিস্থিতি কী, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

    অভিযানের পর প্রথমে জানানো হয়, ছয়জন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে। পরে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন রেস্তোরাঁর কর্মী সাইফুল ইসলাম। তাঁর পরিবার দাবি করে, তিনি হামলাকারী নন, বরং হামলার শিকার।

    অন্যদিকে আইএসের কথিত প্রচারমাধ্যম ‘আমাক’ পাঁচ হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরই মূল হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করে। তারা হলেন রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল।

    অভিযানের পর অভিযান: উগ্র নেটওয়ার্কে বড় ধাক্কা:

    হোলি আর্টিজান বেকারি হামলা ছিল কথিত নব্য জেএমবির সবচেয়ে বড় আঘাত। একই সঙ্গে এটি তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অভিযানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। হামলার ছয় দিন পর, ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার চেষ্টা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হোলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার ঘটনাগুলো একই নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

    এরপর দেশজুড়ে শুরু হয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হন কথিত নব্য জেএমবির প্রধান সংগঠক তামিম আহমেদ চৌধুরী। পরবর্তীতে ঢাকার আজিমপুর, রূপনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে নিহত বা গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হোলি আর্টিজান হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অর্থ, অস্ত্র এবং লজিস্টিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এসব অভিযানে নিহত হন বা গ্রেপ্তার হন।

    হামলার পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। উগ্রপন্থায় জড়িত সন্দেহে নিখোঁজ তরুণদের তালিকা তৈরি করা হয়। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অনলাইন র‌্যাডিক্যালাইজেশন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, গোপন আস্তানা এবং শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণদের লক্ষ্য করে সদস্য সংগ্রহ—এসব বিষয় তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। হোলি আর্টিজান বেকারি হামলার মামলায় আসামিদের ভূমিকা কী ছিল, তা পুলিশের অভিযোগপত্রে বিস্তারিতভাবে উঠে আসে।

    হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তদন্তে বলা হয়, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পাশাপাশি পরিকল্পনা, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও সহায়তার সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

    ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন।

    পরবর্তীতে হাইকোর্ট ওই সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। এর মাধ্যমে দেশের অন্যতম আলোচিত জঙ্গি হামলা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়। হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ঠেকাতে গিয়ে নিহত পুলিশ সদস্যদের স্মরণে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি আজও সেই ঘটনার স্মৃতি বহন করে।

    হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। এই এক দশকে ওই মাত্রার আর কোনো বড় হামলা না ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে, আইএসপন্থী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কারণ, সন্ত্রাসী সংগঠন ভেঙে দেওয়া গেলেও উগ্রবাদী মতাদর্শ, অনলাইন প্ররোচনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পরিচয় সংকটের ভিত্তি মোকাবিলা করতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। তাই এক দশক পরও গুলশানের সেই রাত শুধু শোকের স্মৃতি নয়, বরং রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য একটি স্থায়ী সতর্কবার্তা হয়ে রয়ে গেছে।

    এক দশক পরে দাঁড়িয়ে হোলি আর্টিজান কেবল একটি ঘটনার স্মৃতি নয়, বরং একটি দীর্ঘ প্রশ্নের সারি। রাষ্ট্রীয় অভিযান, বিচার এবং নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দাবি নিরাপত্তা কাঠামোয় দৃশ্যমান সাফল্য এনে দিলেও প্রশ্ন রয়ে যায় আরও গভীরে—একটি সমাজের ভেতরে কীভাবে এমন এক প্রস্তুতির জমি তৈরি হলো, যেখানে পরিচিত মুখগুলো অচেনা সহিংসতার পথে চলে গেল?

    এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি পরিবার, শিক্ষা, অনলাইন জগৎ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভেতরের নীরব পরিবর্তনেরও গল্প। যে পরিবর্তন বাইরে থেকে ধরা পড়ে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত, বিশ্বাস আর পরিচয়ের মানচিত্র বদলে দেয়।

    হোলি আর্টিজান তাই শেষ নয়, এটি এক ধরনের শুরু—যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ কম। কারণ ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়, বড় ধরনের সহিংসতা অনেক সময় হঠাৎ আসে না; বরং অনেক ছোট নীরব বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।

    এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে যায়—আমরা কি কেবল ঘটনাটিকে মনে রাখছি, নাকি সেই কারণগুলোও বুঝতে চেষ্টা করছি, যেগুলো ভবিষ্যতে এমন আরেকটি ঘটনার জন্ম দিতে পারে?

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    অপরাধ

    হোলি আর্টিজান হামলা–সংশ্লিষ্ট ৩১১ উগ্রপন্থী এখনো পলাতক

    জুলাই 1, 2026
    অপরাধ

    জাল সনদে চাকরি, ১৩ শিক্ষকের এমপিও বাতিল

    জুলাই 1, 2026
    অপরাধ

    রূপপুরে যন্ত্রপাতি কেনায় ১৮৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

    জুন 30, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.