রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে দিনের আলোয় এক যুবক প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছিলেন। তাঁর পেছনে ছুটছিল একদল কিশোর। কারও হাতে চাপাতি, কারও হাতে ধারালো অস্ত্র। কয়েকজনের কোমরে ছিল ছোট আগ্নেয়াস্ত্র। প্রাণভয়ে তিনি বারবার সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। ধাওয়া করে ধরে প্রকাশ্যেই তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গত শুক্রবার পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি পুলিশের নথিতে স্থান পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাজিয়া মিছিল থেকে ধাওয়া করে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী জাকির হোসেনকে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জনসমক্ষে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
শুধু নির্জন জায়গায় নয়, জনাকীর্ণ সড়ক ও বাজারেও এসব অপরাধ ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত থাকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এদের দমনে র্যাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছে।
র্যাবের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ২৩৭টি গ্যাংয়ের তথ্য ছিল। অর্থাৎ নতুন তালিকায় আরও ১০২টি গ্যাং যুক্ত হয়েছে। এই তালিকার ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হচ্ছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বুধবার জানান, নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজার। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে অনেককে আটক করা হয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিকভাবেও এই প্রবণতা রোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, একই পাড়া বা মহল্লার বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরা দল গড়ে কিশোর গ্যাং তৈরি করছে। এসব দলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমধর্মী নামে তারা নিজেদের পরিচিতি তৈরি করে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। প্রতিটি দলে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য থাকে। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত। সদস্যদের হাতে ছুরি, চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্রও থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে তারা।
মোহাম্মদপুরে স্টার বন্ড, লাড়া দে, গ্রুপ টোয়েন্টি, ফিল্ম ঝিরঝির, দেখে ল, চিনে ল, লেভেল হাই ও কোপাইয়া দে নামে গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। ধানমণ্ডিতে নাইন এমএম, একে ৪৭, ফাইভ স্টার, ইলেভেন স্টার ও সেভেন স্টারসহ একাধিক গ্যাং রয়েছে। তেজগাঁওয়ে জুম্মন গ্যাং ও পাংকু গ্যাংয়ের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দল সক্রিয়।
উত্তরায় আগে বিল বস, নাইন স্টার, পাওয়ার বয়েজ, সুজন ফাইটার, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, আলতাফ জিরো, ত্রিগোল, তুফান ও নাইন এমএম গ্রুপের দাপট ছিল। এখন সেখানে আরও নতুন গ্যাং সক্রিয় হয়েছে। মিরপুরে বিচ্ছু বাহিনী, রিপন গ্যাং, সুমন গ্যাংসহ বিভিন্ন নামে দল রয়েছে। পুরান ঢাকায় কোবরা গ্যাং, জুম্মন গ্যাং ও বড় পোলা গ্যাংয়ের পাশাপাশি আরও অনেক গোষ্ঠী তৎপর। রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও অদ্ভুত ও চটকদার নামে নতুন নতুন কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করছে এবং তাদের হাতে আধুনিক অস্ত্র রয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলায় প্রকাশ্যে কয়েকজন কিশোরকে সিগারেট খেতে নিষেধ করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ছয়জনকে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন ধরনের অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। তাদের দমনে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তাদের অপরাধ আরও বাড়তে পারে। এতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থেকে এসব গ্যাংকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। মাঠপর্যায়ে গ্যাং সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও তাদের পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। তাই গ্যাং সদস্যদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আগের এক প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, কিশোরদের মধ্যে তথাকথিত ‘হিরোইজম’-এর মানসিকতা থেকেই গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার শুরু হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী থেকেই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক তৎপরতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালের শেষ দিকে তৈরি এক প্রতিবেদনে রাজধানীসহ সারা দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ঢাকায় ছিল ৬৬টি এবং চট্টগ্রামে ৫৭টি।
ডিএমপির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাজধানীর আটটি অপরাধ অঞ্চলের বিভিন্ন থানায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে রাজধানীর বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে এবং তাদের অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা অভিভাবকদের দায়িত্ব। অন্যদিকে গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মাদকাসক্তি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা বাড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে। তবু তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে কিশোর অপরাধ কমাতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা, ক্ষতিকর অনলাইন অ্যাপ শনাক্ত করে বন্ধ করা, এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরি করে কিশোর গ্যাংয়ের হটস্পট চিহ্নিত করা এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান চালানো।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এ কারণে কিশোর গ্যাং দমনে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

