জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সুবিধাভোগীদের জন্য সরাসরি অনুদানের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরামর্শক, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে। এ কারণে প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড)-এর অর্থায়নে এক বছর নয় মাস মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহায়তা দেওয়া হবে এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষের জীবিকা উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
তবে প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে অনুদান হিসেবে পৌঁছাবে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেটের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ সরাসরি দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় হবে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অফিস পরিচালনা এবং অন্যান্য খাতে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, তিন জেলার ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের মধ্যে ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৪৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। এসব পরামর্শকের পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ, সুবিধাভোগীদের জন্য সরাসরি অনুদানের পরিমাণ যেখানে প্রায় ৮ কোটি টাকা, সেখানে শুধু পরামর্শকদের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
এদিকে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং বিদেশ সফরের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের জন্য আরও ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। অফিস ভবন ভাড়ার জন্য রাখা হয়েছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র জানিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক বেশি ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, প্রশাসনিক ব্যয়, ইউটিলিটি বিল, দাপ্তরিক সরঞ্জাম, পরিবহন, জ্বালানি এবং অন্যান্য সেবা ও সরবরাহ খাতে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রস্তাবনায় সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। বাস্তুচ্যুত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কীভাবে নির্বাচন করা হবে, তার স্বচ্ছ রূপরেখা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগও উঠেছে। প্রকল্পের মেয়াদের উল্লেখযোগ্য সময় ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পিইসি সভায় প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে কমিশন। বিশেষ করে পরামর্শক নিয়োগ, বিদেশ সফর, অফিস ভাড়া এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। পাশাপাশি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল সুবিধাভোগীদের ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা। কিন্তু বাজেটের বড় অংশ অন্য খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কারণে পিইসি সভায় প্রকল্পটির প্রতিটি ব্যয় খাত খতিয়ে দেখা হবে। যেসব খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে, সেগুলো কমানোর সুপারিশও করা হবে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ যদি পরামর্শক ও প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত উপকার হবে না। তাদের মতে, ব্যয় কাঠামো সংশোধন না হলে এটি সরকারি অর্থ ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করবে। তবে ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়ে দায় নিতে রাজি নয় সমাজসেবা অধিদপ্তর। সংস্থাটির দাবি, এটি একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং দাতা সংস্থার নির্ধারিত কাঠামো অনুসারেই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটির মূল চুক্তি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর মাধ্যমে হয়েছে। এটি দাতা সংস্থার শর্ত অনুযায়ী প্রস্তুত করা একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প।
অনুদানের তুলনায় পরামর্শক ও প্রশাসনিক ব্যয় বেশি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু এটি দাতা সংস্থার অনুদানের অর্থ, তাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের নির্ধারিত শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। তার ভাষ্য, প্রকল্পের প্রস্তাবনা সমাজসেবা অধিদপ্তর তৈরি করেনি; জিআইজেড সেটি প্রস্তুত করে তাদের কাছে পাঠিয়েছে।
বিদেশ সফরের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কেবল প্রস্তাবিত ব্যয়। সরকার অনুমোদন দিলে তবেই সফর হবে, অন্যথায় ওই অর্থ ব্যয় হবে না। অফিস ভাড়ার বরাদ্দও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনেই রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

