নিজেদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ সড়কের বাসিন্দা দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী। হঠাৎ মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা দুই যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি তার বাম পায়ে বিদ্ধ হয়ে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ওই শিক্ষার্থী খুলনা মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর বোন।
গত শুক্রবার সন্ধ্যার এই ঘটনার এক দিন আগেই নগরের লবণচরা থানার আশিবিঘা বালুর মাঠে ২২ বছর বয়সী এক যুবককে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তার ডান ঊরুতে গুলি লাগে। এরও আগে ২৯ জুন রাতে নগরের গল্লামারী এলাকায় গুলিতে আহত হন রফিকুল ইসলাম (৩৫)। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে খুলনায় ঘটে তিনটি গুলির ঘটনা।
পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস। প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার এবং পুরোনো বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনা মহানগরে ১৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর আরও ৩৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, নগরে অন্তত কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকাতেও অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করছে না। পুলিশের দাবি, অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
খুলনায় কেন একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে কেন আসছে না—এ বিষয়ে খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, মহানগরে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। পাশের সাতক্ষীরা, যশোর ও বাগেরহাট সীমান্তবর্তী জেলা। অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই পরিস্থিতিকে অস্থির করছে। তবে প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হয়েছে, অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, আসামি শনাক্ত হয়েছে। আশা করা হচ্ছে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।
দাপট দেখাচ্ছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ:
খুলনার অধিকাংশ আলোচিত অপরাধে কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনীর নাম ঘুরেফিরে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব গ্রুপ এখন এতটাই শক্তিশালী যে জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালাতেও পিছপা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা প্রতিরোধ গড়তে সাহস পাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দুর্বল তৎপরতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এসব বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়েছে। যদিও পুলিশের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা রয়েছে এবং অভিযানও চলছে, তবে মূল পরিকল্পনাকারীরা অধিকাংশ সময় অধরাই থেকে যাচ্ছে।
জামিনে বেরিয়ে আবারও জড়াচ্ছে অপরাধে:
পুলিশ, কারাগার ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, খুলনার একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের ১৩ মে ভারতের কলকাতায় আলোচিত হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া শিমুল ভূঁইয়া ৮ জুন হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তী জামিন পান।
গত ২২ ডিসেম্বর মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধে গুলিবিদ্ধ হন এক রাজনৈতিক নেতা মোতালেব শিকদার। পরে শুটার শামীম ওরফে ঢাকাইয়া শামীম গ্রেপ্তার হন এবং ১৩ মে জামিনে মুক্তি পান। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তির পর তিনি আবারও অপরাধে জড়ান। গ্রেনেড বাবু ও নূর আজিম গ্রুপের কয়েকজন সদস্যও সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত ৬ মে বটিয়াঘাটার চক্রাখালী এলাকায় রিভলবার, গুলি ও মাদকসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। পরে তাদের দুইজন কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর পরপরই ৮ মে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে হত্যা এবং আরও একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার করা ও আদালতে সোপর্দ করা পুলিশের দায়িত্ব। জামিন বা মুক্তির সিদ্ধান্ত আদালতের। জামিনে বের হলে পুলিশের কিছু করার থাকে না। তিনি আরও বলেন, অনেক অপরাধী বাইরে থেকে এসে দ্রুত অপরাধ করে পালিয়ে যায়, এতে শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সেলিনা আহমেদ বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন জরুরি।

