টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার জোকারচরে ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতু ছয় বছরেও শেষ হয়নি। মাত্র তিনটি পিলার নির্মাণের পর থেমে আছে ৩৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পটির কাজ। এর মধ্যে ঠিকাদারি জটিলতা, অংশীদারদের বিরোধ ও অনিয়মের অভিযোগে প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ হলেও সেতুর দৃশ্যমান অগ্রগতি বলতে রয়েছে শুধু নদীর দুই পাশে তিনটি পিলার।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার এই সেতু এখন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, কাজ বিক্রির অনিয়ম এবং তদারকির দুর্বলতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পশ্চিম পাশে মাহমুদ নগরের গোল চত্বর থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ধলেশ্বরী নদীর ওপর ২৬৪ মিটার দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হায়দার কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড, অবনী এন্টারপ্রাইজ এবং সৈয়দ মজিবুর রহমান জেভি নামে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ পায়। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ছিল ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কার্যাদেশ পাওয়ার পর অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। এর ফলে প্রায় দেড় বছরেও কাজ শুরু করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
পরে অংশীদার সৈয়দ মজিবুর রহমান নিজ উদ্যোগে নির্মাণকাজ শুরু করেন। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি সেতু নির্মাণে প্রায় ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। তবে এর কিছুদিন পর অন্য অংশীদার অবনী এন্টারপ্রাইজের মালিক হেকমত আলী লোকজন নিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন।
এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। টাকা ফেরত চেয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন করেন সৈয়দ মজিবুর রহমান। বিষয়টি নিয়ে একাধিক মামলা ও পাল্টা মামলাও হয়।
অভিযোগ রয়েছে, পরে হেকমত আলী অন্য দুই অংশীদার হায়দার কনস্ট্রাকশন ও সৈয়দ মজিবুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে গাজীপুরের ঠিকাদার রফিকুল ইসলামের কাছে সেতুর কাজ বিক্রি করে দেন।
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, হেকমত আলীর মাধ্যমে কাজ নেওয়ার পর তিনি সেতু নির্মাণে প্রায় ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় করেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন, প্রয়োজনীয় অংশীদারদের অনুমোদন ছাড়াই এবং স্বাক্ষর জাল করে কাজটি তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর তিনি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে প্রতিবাদ করায় তাঁকে এলেঙ্গা রিসোর্টে আটকে রেখে চুক্তিপত্র ফেরত নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং এখনো তাঁর টাকা ফেরত পাননি।
এদিকে, হেকমত আলী এলজিইডির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মাত্র তিনটি পিলার নির্মাণ করেই ৯ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৩ টাকা বিল তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর হেকমত আলী আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে। এরপর সেতুর নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তবে এলজিইডি বলছে, আগের ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন করে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ কমাতে গত ৯ মার্চ নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। নতুন দরপত্রে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭৯ টাকা।
এবার কাজ পেয়েছে চৌধুরী-এলহোজ জয়েন্ট ভেঞ্চার। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২২ মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার সময় দেওয়া হয়েছে।
জোকারচর গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, সেতুটি নির্মাণ হলে টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প পথ তৈরি হবে। বিশেষ করে ঈদের সময় মহাসড়কের চাপ কমাতে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সৈয়দ মজিবুর রহমান বলেন, অন্য দুই অংশীদার কাজ করতে না চাওয়ায় স্ট্যাম্পে লিখিতভাবে দায়িত্ব দেওয়ার পর তিনি নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরে হেকমত আলী বাধা দেওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর দাবি, বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পেতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করেছেন এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানার পারভীন বলেন, ঠিকাদারদের পারস্পরিক বিরোধের কারণেই নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। আগের ঠিকাদার যতটুকু কাজ করেছেন, তার বিল নিয়ম অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। নতুন করে দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে এবং এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে।
ধলেশ্বরী নদীর ওপর এই সেতু নির্মাণ প্রকল্প এখন শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ নয়, বরং দীর্ঘসূত্রতা, ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরকারি প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

