কর্ণফুলী নদীর নিচে নির্মিত দেশের প্রথম ডুবো টানেল প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংস্থা বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাছ লাগানোর জন্য বরাদ্দ ৪৮ কোটি টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো গাছই রোপণ করা হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত তিন অর্থবছরে ৬৮টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যে ৪৮টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বড় ধরনের অনিয়মের একটি অংশ হিসেবে ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের বিষয়টি সামনে আসে। সংস্থাটি বলছে, এই অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ছিল না এবং টানেলের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। এই এলাকায় বাংলো, মোটেল, কনভেনশন সেন্টার, চিকিৎসা কেন্দ্র ও জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার সঙ্গে টানেলের সরাসরি সড়ক সংযোগ নেই। একে পুরোপুরি অপচয় ও নীতিগত অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ল্যান্ডস্কেপিং ও গাছ লাগানোর কাজে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা চূড়ান্ত নথিতে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনিয়মের তালিকায় রয়েছে আপৎকালীন তহবিল থেকে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়, একই ধরনের ব্যয় থাকলেও আলাদা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, ২২৪ কোটি টাকার অননুমোদিত মূল্য সমন্বয় এবং অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা সুপারভিশন ফি প্রদান। পাশাপাশি বরাদ্দের বাইরে আরও ৯০ কোটি টাকা খরচের তথ্যও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ক্রয় নীতি ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের কারণে এসব অনিয়ম ঘটেছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং মেয়াদ দ্বিগুণ হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। প্রশাসনিক দুর্বলতার দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রকল্পের জন্য কেনা ২৯টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৬টি সেতু বিভাগকে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ২৩টি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী বড় বাজেটের প্রকল্পে একজন অভিজ্ঞ পূর্ণকালীন পরিচালক থাকার কথা থাকলেও এখানে অন্তত চারজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। এক পর্যায়ে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী দুই বছর অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রকল্প পরিচালনা করেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি ২০১৫ সালের নভেম্বরে এই প্রকল্প অনুমোদন দেয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে বড় অংশ চীনের একটি রপ্তানি আমদানি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়, যা নির্দিষ্ট সময় পর কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, টানেল চালুর পর যানবাহন চলাচল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। ফলে এটি এখন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাক্কলনে প্রতিদিন প্রায় ২৮ হাজার যানবাহন চলাচলের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে শুরুতে তা নেমে আসে ৫ থেকে ৬ হাজারে। পরে তা আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজারের কাছাকাছি।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার হালকা যানবাহন চলাচল করছে, যা পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ। ভারী যানবাহনও এই পথ এড়িয়ে চলছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ২২ লাখ টাকা হলেও আয় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। এতে বছরে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। টোল বা ব্যবহার ফি বাড়ালে যানবাহন আরও কমে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
টানেলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক অবকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর, ড্রাই ডক এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের মতো প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে টানেলের সংযোগ বাড়িয়ে মাতারবাড়ী বন্দর ও কক্সবাজারকে যুক্ত করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াতের সুবিধা ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয় তুলে ধরে প্রচারণা চালানোর কথা বলা হয়।
সার্ভিস এলাকার ব্যবহার নিয়েও নতুন পরিকল্পনার পরামর্শ এসেছে। এটি বেসরকারি খাতে বা পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে টানেল ঘিরে আধুনিক নগর অবকাঠামো, লজিস্টিকস হাব ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
সব অনিয়ম ও দুর্বলতার মধ্যেও কর্ণফুলী টানেলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ডুবো টানেল এবং দেশের প্রকৌশল সক্ষমতার বড় উদাহরণ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে সহায়ক অবকাঠামো দ্রুত না হলে, যানবাহন না বাড়লে এবং পরিচালনা খরচ নিয়ন্ত্রণে না এলে এই প্রকল্পের সম্ভাবনা পূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাবে না বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

