রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ কমছে না। কোথাও তারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনুসারী, কোথাও মাদক ব্যবসার সহযোগী, আবার কোথাও চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা হামলার সামনের সারির সদস্য হিসেবে কাজ করছে। বয়স কম হওয়ায় গ্রেফতারের পরও অনেক ক্ষেত্রে আইনের বিশেষ সুবিধা পেয়ে তারা দ্রুত মুক্তি পায়। এরপর পুরোনো এলাকায় ফিরে নতুন নামে বা নতুন প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শুধু গ্রেফতার ও অভিযান দিয়ে কি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরাকে কেন্দ্র করে এখনও শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের সদস্যরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভাড়াটে হামলা, অস্ত্রের মহড়া, জমি দখল এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধেও জড়িত বলে পুলিশের তথ্য বলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করলেও অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যেই জামিন বা মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ফিরে যাচ্ছে। এতে একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটলেও বদলে যাচ্ছে শুধু গ্যাংয়ের নাম বা তাদের রাজনৈতিক পরিচয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাং এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু অভিযান বা গ্রেফতার করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। তাদের মতে, গ্যাং সদস্যদের পাশাপাশি অর্থদাতা, মাদক সরবরাহকারী, স্থানীয় ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধ থেকে সুবিধাভোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজকে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
ডিএমপির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় মোট ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২টি গ্যাং রয়েছে মিরপুর বিভাগের সাতটি থানায়। শুধু পল্লবী থানাতেই সক্রিয় রয়েছে ১৪টি গ্যাং। তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানায় রয়েছে ২৬টি কিশোর গ্যাং, যার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায় একাই রয়েছে ১৬টি। এছাড়া রমনা বিভাগে ছয়টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ১৩টি, মতিঝিলে ১০টি, গুলশানে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হিসাবে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১০০-এর কম। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকা তৈরির পদ্ধতি ও গ্যাং চিহ্নিত করার সংজ্ঞায় পার্থক্য থাকায় দুই সংস্থার হিসাবে কিছু অমিল দেখা যায়। অনেক সময় একটি গ্যাং ভেঙে নতুন নামে সংগঠিত হয়, আবার একই সদস্য একাধিক গোষ্ঠীর সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, একটি কিশোর গ্যাংয়ে সাধারণত সাত থেকে ২০ জন সদস্য থাকে। তাদের অধিকাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। দেশীয় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি কিছু গ্যাংয়ের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া সদস্যদের বড় একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক সেবন কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজনৈতিক পালাবদলে বদলেছে কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয়দাতা:
সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব, প্রভাববলয় ও আনুগত্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগে যেসব চক্র স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ছাত্রসংগঠনের নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের অনেকেই এখন নতুন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কেউ নতুন নেতৃত্বের অনুসারী হয়েছে, আবার কেউ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য নতুন গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে।
এ সময়ের ক্ষমতার রদবদল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কোথাও পুরোনো গ্যাং নতুন পরিচয়ে সক্রিয় হয়েছে, আবার কোথাও একটি গোষ্ঠী ভেঙে একাধিক নতুন চক্রের জন্ম হয়েছে। এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, পার্কিং, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ছোট আকারের টেন্ডার এবং জমি দখলের মতো বিভিন্ন খাতে আধিপত্য ধরে রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, হামলা, চাঁদা আদায় কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শক্তি প্রদর্শনের মতো কাজেও তাদের সামনে রাখা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর এলাকায় এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, শুটার আনোয়ার গ্রুপ, কব্জি কাটা গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, ‘দ্য কিং অব লও ঠেলা’ এবং ডায়মন্ড গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতার চললেও একটি চক্র ভেঙে অন্য নামে পুনর্গঠনের প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
‘অপরাধী জন্মায় না, অপরাধে জড়িয়ে পড়ে’:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের মতে, সমাজে শক্তির প্রদর্শন এবং অবৈধ স্বার্থ রক্ষার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেখানে কিশোরদের সহজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি অংশকে পরিকল্পিতভাবে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এভাবেই অপরাধী চক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়।
তিনি বলেন, কোনো কিশোর জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ নয়। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা প্রভাবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাকে অপরাধের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরুতে ছোটখাটো দায়িত্ব—যেমন মাদক পৌঁছে দেওয়া, তথ্য সংগ্রহ, এলাকায় মহড়া দেওয়া, চাঁদা আদায় বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অভিজ্ঞ অপরাধীদের তত্ত্বাবধানে তারা আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
অধ্যাপক রেজাউল করিমের ভাষায়, আজ যারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তাদের একটি অংশ ভবিষ্যতে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নেতৃত্বেও যেতে পারে। সহজে অর্থ, অস্ত্র, মোটরসাইকেল, সামাজিক পরিচিতি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ অনেকের কাছে অপরাধকে আকর্ষণীয় করে তোলে। তাই বিষয়টিকে কেবল বখে যাওয়া কিশোরদের সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কিশোররা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে।
তার মতে, কেবল গ্রেফতার বা অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদক ব্যবসায়ী, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধচক্রের মূল পরিকল্পনাকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং দমনে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল। এজন্য গ্যাং সদস্যদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তকরণ, অর্থ ও মাদকের উৎস অনুসন্ধান, দ্রুত বিচার, কার্যকর সংশোধন ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের শিক্ষা ও কর্মমুখী কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় কিছু সদস্য গ্রেফতার হলেও সাময়িক বিরতির পর নতুন নাম ও নতুন পৃষ্ঠপোষকের অধীনে একই ধরনের অপরাধচক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
শুধু গ্রেফতারেই কি থামবে কিশোর গ্যাং?
কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও শুধু গ্রেফতারকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুর এলাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। অনেক অপরাধী আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে এসে অপরাধ সংঘটিত করে আবার ফিরে যায়। এছাড়া জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক কিছু অপরাধী চক্রের সঙ্গে কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে।
তার ভাষ্য, কেবল গ্রেফতার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পরিবারকে সন্তানের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং স্থানীয় সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিতে হবে। এ লক্ষ্যে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরার কিশোর গ্যাংগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। নিয়মিত অভিযানে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে অনেককে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু সংশোধনের সুযোগ পাওয়ার পরও তাদের একটি অংশ আবারও পুরোনো অপরাধচক্রে ফিরে যাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান আইন এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমস্যার দায় শুধু পুলিশ, বিচার বিভাগ বা সমাজের ওপর চাপিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না; বরং সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
মো. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার বন্ধ করাও জরুরি। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে কিশোরদের মিছিলের সামনের সারিতে রাখা হয়, উসকানি দেওয়া হয় এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব যদি এ ধরনের চর্চা বন্ধে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

