সরকারি চাকরিতে একজন গাড়িচালকের মাসিক বেতন সীমিত কিন্তু সেই আয়ের সঙ্গে যার জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন, তাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। রাজধানীতে একাধিক দামি ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি এবং বিভিন্ন স্থানে জমির মালিকানা—এসব সম্পদের উৎস নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গাড়িচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর বছিলার গার্ডেন সিটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে তার নামে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া শেওড়াপাড়ায় রয়েছে আরও একটি মূল্যবান ফ্ল্যাট। নিজ জেলা বরিশালেও তার নামে জমি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন বাগানবাড়ি, যার নির্মাণ ব্যয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে।
জানা যায়, বরিশালের উজিরপুর উপজেলার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান সাখাওয়াত হোসেন চাকরিজীবনের শুরুতে ছিলেন একজন সাধারণ গাড়িচালক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন বলেও অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অসদাচরণের ঘটনায় একাধিকবার তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তার প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, চাকরিতে যোগদানের সময় ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহারের অভিযোগ ছিল সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে। ফায়ার সার্ভিসের নথিপত্রে এ অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উজিরপুরে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি:
সাখাওয়াত হোসেনের সম্পদের অন্যতম আলোচিত অংশ তার নিজ জেলা বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের কেশবকাঠি গ্রামে নির্মিত বাগানবাড়ি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর নির্মাণাধীন এ বাড়িটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনতলা ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। প্রথম ও দ্বিতীয় তলা ডুপ্লেক্স নকশায় নির্মাণ করা হয়েছে এবং তৃতীয় তলার কাজ এগিয়ে চলছে। বাড়ির প্রতিটি কক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের নির্মাণসামগ্রী, দৃষ্টিনন্দন কাচ, আধুনিক স্যানিটারি সরঞ্জাম এবং বিশেষ আলোকসজ্জা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এটিকে সাধারণ আবাসিক ভবনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও বিলাসবহুল বলে বর্ণনা করেছেন।
বিপুল সম্পদের উৎস, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উজিরপুরে নির্মাণাধীন সাখাওয়াত হোসেনের ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি তৈরিতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাদের দাবি, বাড়িটির নির্মাণশৈলী, অভ্যন্তরীণ নকশা এবং ব্যবহৃত আধুনিক নির্মাণসামগ্রী দেখে সহজেই বোঝা যায় এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি স্থাপনা। অনেকের মতে, ভবনের নকশা ও সুযোগ-সুবিধা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাড়ির সঙ্গেও তুলনীয়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার দাবি, একজন সরকারি গাড়িচালকের বৈধ আয়ের সঙ্গে এমন ব্যয়বহুল বাড়ি নির্মাণের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের ভাষায়, এ ধরনের বাড়ি নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা একজন সাধারণ কর্মচারীর দীর্ঘ কর্মজীবনের আয় দিয়েও সম্ভব নয়।
সাখাওয়াত হোসেনের গ্রামের বাড়ি নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার স্থায়ী ঠিকানা বরিশালের উজিরপুর উপজেলার মশাং এলাকায়। তার বাবা প্রয়াত আনছার আলী মল্লিক ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, ফায়ার সার্ভিসে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই সাখাওয়াতের আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে আত্মীয়স্বজনসহ এলাকার অনেক মানুষের চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। তাদের ভাষ্য, ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল শহরের আলেকান্দা এলাকাতেও জমি কিনেছেন সাখাওয়াত হোসেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দাগ নম্বর ৬৭৯৪-এর সাত শতক জমি তিনি জাকির শরীফ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিনেছিলেন।
জমির বিক্রেতা মোহাম্মদ জাকির শরীফের দাবি, ২০০৭-০৮ সালের দিকে জমিটি বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই জমির বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি। তার আরও দাবি, বরিশালের চৌমাথা এলাকাতেও সাখাওয়াতের নামে আরও জমি রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। জাকির শরীফ আরও বলেন, সাখাওয়াত নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিভিন্ন সময় তিনি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাজধানীতে একাধিক দামি ফ্ল্যাট:
শুধু নিজ জেলা নয়, রাজধানী ঢাকাতেও উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে। সরেজমিনে দেখা যায়, মোহাম্মদপুর-সংলগ্ন বছিলা গার্ডেন সিটি এলাকায় গার্ডেন রাজধানী বিল্ডার্সের একটি ভবনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার নামে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ফ্ল্যাটটির বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।
এছাড়া রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় প্রায় এক হাজার ৪৫০ বর্গফুট আয়তনের আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট প্রায় সাত হাজার টাকা দরে কেনা ওই ফ্ল্যাটটির বর্তমান মূল্য এক কোটি টাকারও বেশি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ডেমরার কোনাবাড়ি এলাকায় একটি আবাসন প্রকল্পে তার চারটি শেয়ার ছিল। এর মধ্যে দুটি সম্প্রতি পুলিশের এক কর্মকর্তার কাছে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এছাড়া তার নামে ও বেনামে আরও সম্পদ এবং রাজধানীতে অতিরিক্ত ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি।
বছিলা ও শেওড়াপাড়া এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবেশীদের অনেকেই সাখাওয়াতকে ফায়ার সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে মনে করতেন। তাদের ভাষ্য, তিনি নিয়মিত দামি স্পোর্টস ইউটিলিটি যানবাহনে (এসইউভি) যাতায়াত করতেন এবং তার জীবনযাত্রায় ছিল স্পষ্ট আভিজাত্যের ছাপ। অনেকেই জানতেন না, তিনি মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন গাড়িচালক। স্থানীয়দের দাবি, দায়িত্ব পালনের বাইরে তিনি সবসময় পরিপাটি পোশাকে চলাফেরা করতেন এবং রাজধানীর অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁয় তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
সাখাওয়াত হোসেন কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে আরও কিছু অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ফায়ার সার্ভিসের ভেতরে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি ঘিরে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেই চক্রের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের বাইরেও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগসংক্রান্ত তদবিরে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এক মহাপরিচালকের (ডিজি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন। তাদের অভিযোগ, ওই সময়ের প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নিয়োগ ও বদলি-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। এমনকি দুই বছরের ওই মেয়াদকালে এসব কার্যক্রম থেকে কয়েক কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাখাওয়াত বা সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একাধিক সূত্র আরও দাবি করেছে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি নিজের একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোন কর্মকর্তার কক্ষে কারা যাতায়াত করছেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সাখাওয়াত একজন গাড়িচালক হলেও নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত বিষয়ে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের দাবি, অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত প্রশাসনিক বিষয়ে তার সহযোগিতাও চাইতেন। এছাড়া কিছু নিবন্ধনহীন অনলাইন মাধ্যম ও কথিত সাংবাদিকদের ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে সাখাওয়াত হোসেন ডেপুটেশনে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার গাড়িচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দায়িত্ব পালনের সময় গড়ে ওঠা পরিচিতি ও প্রভাবকে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে নিজ জেলার হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান শিকদারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্রগুলোর দাবি, এই প্রভাবের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় নিয়মিত চালকের দায়িত্ব পালন না করেও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় থাকতেন।
ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সাখাওয়াতের পরিচিত ব্যক্তিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে তিনি বড় ধরনের শাস্তি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
কয়েকটি সূত্রের আরও দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের উপহার ও আর্থিক সুবিধা দিতেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্যও মেলেনি।
ফায়ার সার্ভিসের নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, চাকরিতে যোগদানের সময় ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর ২০০৭ সালে সরকারি কর্মচারী আইনের আওতায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সে সময় এক বছরের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং তিরস্কারমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়েও চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেনের একাধিক অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে একাধিক বিভাগীয় মামলা:
ফায়ার সার্ভিসের নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে রিয়াদ আহমেদ নামে এক চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি অভিযোগ সামনে আসে। মৌখিক পরীক্ষার সময় নিয়োগসংক্রান্ত আর্থিক চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। পরে ওই মামলায় তাকে তিরস্কারমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।
আরেকটি ঘটনায় মো. আনিসুর রহমান অভিযোগ করেন, তার ভাগনে মো. রণ মাহবুবকে ফায়ারফাইটার পদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাখাওয়াত ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। বিভাগীয় তদন্তে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন মহাপরিচালক তাকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একই ধরনের অভিযোগ একাধিকবার ওঠা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ চলমান নিয়োগ কার্যক্রমে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। বর্তমানে তিনি সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন। বরখাস্তের পর তাকে সুনামগঞ্জের শাল্লা ফায়ার স্টেশনে বদলি করা হলেও তিনি নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগ দেননি বলে ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
শুধু দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগই নয়, ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত আচরণ নিয়েও বিতর্কের মুখে পড়েছেন সাখাওয়াত হোসেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, শৃঙ্খলাভঙ্গ, পারিবারিক বিরোধ এবং বিভিন্ন অভিযোগের কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি—উভয় ধরনের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সম্প্রতি তার স্ত্রী আফরোজা খানম যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন এবং পরকীয়ার অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করেছেন। এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বদলিকৃত কর্মস্থল সুনামগঞ্জের শাল্লা ফায়ার স্টেশনে যোগদান না করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, অতীতের মতো শুধু সতর্কবার্তা বা লঘু শাস্তিতে বিষয়টি শেষ করা হবে না। অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ও নথি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিয়োগ বাণিজ্য, শৃঙ্খলাভঙ্গসহ সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরই মধ্যে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
শাল্লা ফায়ার স্টেশনে বদলির পরও যোগদান না করার বিষয়ে ডিজি বলেন, বিষয়টি প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধিমালা অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের ভেতরে অভিযোগ থাকা প্রভাবশালী চক্রের বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অনিয়ম কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও সব পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়, তবে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি।
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার ব্যবহৃত কয়েকটি মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনি নিয়মিত মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করেন এবং অপরিচিত নম্বরের কল গ্রহণ করেন না।
পরে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে পরিচয় দিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে লিখিত বার্তাও পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

