একটি ভুল পরিচয়ের কারণে নিরপরাধ একজন মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। সেই ঘটনার স্মৃতি আবারও সামনে এসেছে, কারণ অনলাইনভিত্তিক মাদক অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে নতুন আইনি সংশোধন পাস হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণের মানদণ্ড ও তদন্তের নির্ভুলতা নিশ্চিত না হলে এমন আইন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে কাশিমপুর কারাগারে এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। কারাবন্দি আরমানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন একজন দর্শনার্থী। পরে জানা যায়, তিনি আর কেউ নন—মাদক মামলার প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিন। আরমান ঢাকার পল্লবী এলাকার একজন বেনারসি কারিগর। ২০১৬ সালে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু অভিযোগ ছিল, যে মামলায় তাকে আটক করা হয়েছিল, সেটির আসামি তিনি ছিলেন না। প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তার বাবার নাম একই হওয়ায় পরিচয় বিভ্রাটের শিকার হন তিনি। পরিবারের দাবি, ওই ভুলের কারণে আরমানকে তিন বছর কারাভোগ করতে হয়।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কারাগারে এসে শাহাবুদ্দিন নাকি আরমানকে মামলা নিয়ে মুখ না খোলার হুমকিও দিয়েছিলেন। ঘটনাটি বিচারব্যবস্থা ও তদন্ত প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা নিয়ে সে সময় ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। এই ঘটনাই আবার আলোচনায় এসেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনের পর।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী অনুযায়ী, অনলাইনে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা এর বিজ্ঞাপনের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আসামির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার না হলেও মামলা পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ কারণে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, যদি তদন্ত যথাযথভাবে না হয় অথবা ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া দুর্বল থাকে, তাহলে নিরপরাধ ব্যক্তিও হয়রানির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে স্ক্রিনশট, অনলাইন বার্তা বা অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই জরুরি বলে তারা মনে করেন।
বাংলাদেশে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও নির্দিষ্ট পরিমাণ মেথামফেটামিনসহ কিছু গুরুতর অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
এ আইনের আওতায় ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। ২০২২ সালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় তিন কেজি হেরোইনসহ বতসোয়ানার এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৪ সালে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে তার আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছিলেন, তিনি মূল চক্রের সদস্য নন; বরং মাদক বহনের জন্য ব্যবহৃত একজন ‘ক্যারিয়ার’ ছিলেন। যদিও আদালতের রায়ে সেই দাবি গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশে বর্তমানে দুই হাজারেরও বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে এবং দ্য ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্ট পরিচালিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশ সমাজের দরিদ্র, প্রান্তিক ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে। গবেষণাটি মৃত্যুদণ্ডের সামাজিক প্রভাব ও বিচারপ্রাপ্তির বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর শাস্তির পাশাপাশি সঠিক তদন্ত, নির্ভুল পরিচয় নিশ্চিত করা, ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আইনের কার্যকর প্রয়োগের প্রধান শর্ত। অন্যথায় ভুল পরিচয় বা ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ঘটনাগুলো আবারও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
মাদক চক্রের আসল নিয়ন্ত্রকরা কতটা ধরা পড়ছে?
বাংলাদেশে ইয়াবা উৎপাদনের কোনো কারখানা নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার প্রায় সবই মিয়ানমার থেকে আসে। বিশেষ করে শান ও চিন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত এই মাদক বর্তমানে সংঘাতপ্রবণ সীমান্ত অঞ্চল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই চোরাচালানকে ঘিরে নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথাও উঠে এসেছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার কারণে প্রচলিত অর্থ লেনদেন ব্যাহত হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য আদান-প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, চিনি, পেঁয়াজ, সার ও জ্বালানির মতো পণ্য পাচার হওয়ার বিপরীতে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ দেশে প্রবেশ করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও প্রকাশ্যে এ ধরনের প্রবণতাকে “নারকো-কারেন্সি” বা মাদকভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, স্থল ও সমুদ্র মিলিয়ে অন্তত ১৭টি রুট দিয়ে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে বর্তমানে সমুদ্রপথই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তারা প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ পিস মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে। হিসাব করলে প্রতিদিন গড়ে কয়েক দশ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট আটক হওয়ার চিত্র দেখা যায়।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ধার হওয়া চালানই পুরো চিত্র নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সময়ের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট চোরাচালানের তুলনায় জব্দ হওয়া অংশ অনেক কম। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ মাদক এখনও নজর এড়িয়ে দেশে প্রবেশ করছে বলে ধারণা করা হয়।
এই পাচারচক্রের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে রয়েছে সীমান্ত এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সক্রিয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী শিশুদের ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষা, পরিচয়পত্র ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত এসব শিশু সহজেই অপরাধচক্রের শিকার হয়ে পড়ছে। এসব তথ্য নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—মাদকবিরোধী কঠোর শাস্তির আওতায় বাস্তবে কারা বেশি ধরা পড়ছে?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মাদক উৎপাদনকারী কারখানা, সীমান্তের ওপারের অর্থায়নকারী গোষ্ঠী কিংবা আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা সবচেয়ে কঠিন। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই পরিবহনকারী, বাহক বা নিম্নস্তরের সহযোগী।
তাদের মতে, শুধু কঠোর শাস্তি নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, অর্থায়নের উৎস শনাক্ত করা এবং পাচারচক্রের মূল সংগঠকদের বিচারের আওতায় আনাই দীর্ঘমেয়াদে মাদক নিয়ন্ত্রণে অধিক কার্যকর হতে পারে।
কঠোর আইন, ধীর বিচার—মাদক মামলার বাস্তবতা কী বলছে?
মাদকবিরোধী আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বিচারিক বাস্তবতা ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে। আদালতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা মামলা, তদন্তের দুর্বলতা এবং কম দণ্ডের হার—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে ছয় লাখের বেশি মাদক মামলা বিচারাধীন। মোট ফৌজদারি মামলার উল্লেখযোগ্য অংশই মাদকসংক্রান্ত। ফলে বিচারব্যবস্থার ওপর এ ধরনের মামলার চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
মামলা নিষ্পত্তির গতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, সে সময় বিচারাধীন প্রায় ৪৮ হাজার মাদক মামলা শেষ করতেই প্রায় দুই দশক সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা তখনকার তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শুধু মামলার জটই নয়, বিচারিক ফলাফলও নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের দায়ের করা মামলার এক দশকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৮ শতাংশ মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই মামলার একটিতে আসামি খালাস পেয়েছেন।
কেন এত মামলা প্রমাণ করা যাচ্ছে না, সে বিষয়েও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ এজাহার, আইনসম্মতভাবে জব্দ তালিকা প্রস্তুত না করা, নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও তদন্ত কর্মকর্তার একই ব্যক্তি হওয়া।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ অভিযোগ আনা ও তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকলে বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় একটি স্পষ্ট বৈপরীত্যও সামনে আসে। একদিকে আইনে অল্প পরিমাণ নির্দিষ্ট মাদক বহনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, তদন্তের দুর্বলতা ও প্রমাণ উপস্থাপনের সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলাই আদালতে টেকসই হচ্ছে না।
এর ফলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি দুর্বল তদন্তের কারণে নিরপরাধ বা নিম্নস্তরের অভিযুক্তরাও দীর্ঘ আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতাও এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। ওই সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
একই সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে টেকনাফ এলাকার তৎকালীন এক সংসদ সদস্য ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, সীমান্ত দিয়ে আসা বড় চালানের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। তবে ওই অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি অগ্রগতি না হওয়ায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। পরে ওই সাবেক সংসদ সদস্য দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান বলেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
মাদকবিরোধী লড়াই কার্যকর করতে হলে শুধু কঠোর শাস্তি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। সমানভাবে জরুরি হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মাদক পাচারচক্রের শীর্ষ পর্যায়ের অর্থদাতা ও সংগঠকদের আইনের আওতায় আনা। অন্যথায় কঠোর আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
কঠোর শাস্তি কি মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হয়েছে?
মাদকবিরোধী কঠোর আইন কার্যকর হওয়ার কয়েক বছর পর এর বাস্তব ফলাফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। কারণ সরকারি তথ্য বলছে, আইন আরও কঠোর হলেও মাদকের সরবরাহ ও আসক্ত—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনক প্রবণতা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়। একই সময়ে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ভিন্ন একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর বিভিন্ন সংস্থার জব্দ করা মাদকের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি বলে সরকারি তথ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে।
জব্দের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার ইঙ্গিত দিতে পারে, অন্যদিকে এটি বড় আকারের মাদক প্রবাহেরও প্রতিফলন হতে পারে। তাই কেবল জব্দের পরিমাণ দিয়ে সরবরাহ কমেছে বা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এ বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও দেশটি এখনও আঞ্চলিক মাদক পাচারপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ফিলিপাইনে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের আমলে পরিচালিত বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানে হাজারো মানুষের মৃত্যু হলেও দেশটিতে মাদক সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো আধুনিক মাদক ব্যবসা একটি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন, অর্থায়ন, সীমান্ত অতিক্রম এবং বিতরণ—প্রতিটি ধাপ একাধিক দেশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কেবল একটি দেশের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের নতুন সংশোধিত আইনেও ডিজিটাল মাধ্যমে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। তবে এ বিধান নিয়ে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের উদ্বেগ হলো, ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ ফরেনসিক যাচাই ও নির্ভুল তদন্ত নিশ্চিত না হলে নিরপরাধ ব্যক্তিও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তারা মনে করিয়ে দেন, অতীতে ভুল পরিচয়ের কারণে নিরপরাধ মানুষের কারাভোগের ঘটনাও ঘটেছে। এমন বাস্তবতায় হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট, ভুয়া বার্তা, জাল স্ক্রিনশট বা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক তদন্ত প্রয়োজন।
পরিচয় বিভ্রাটের কারণে কারাভোগ করা আরমানের ঘটনাও এ আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তিনি শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে মুক্তি পান। তবে যে ব্যক্তিকে প্রকৃত আসামি হিসেবে অভিযোগ করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে সুস্পষ্ট তথ্য আর সামনে আসেনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর শাস্তির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তদন্তের মান, ডিজিটাল প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা, নিরপেক্ষ বিচার এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার সক্ষমতার ওপর। এসব ক্ষেত্র দুর্বল হলে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

