সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই চোখে পড়ে এমন অসংখ্য বিজ্ঞাপন। কোথাও মধু সংগ্রহের দৃশ্য, কোথাও সবুজ মাঠ বা খামারের ছবি। সঙ্গে দাবি—‘শতভাগ অর্গানিক’, ‘কেমিক্যালমুক্ত’, ‘নিজস্ব খামার থেকে সরাসরি’। এসব পোস্টের নিচে জমে শত শত অর্ডার, আর ক্রেতাদের বিশ্বাস যেন দিন দিন আরও বাড়ছে।
এই ক্রেতাদের অনেকেই বিশেষ কারণে অর্গানিক পণ্য বেছে নেন। কেউ পরিবারের অসুস্থ সদস্যের জন্য নিরাপদ খাবার খুঁজছেন। কেউ শিশুর প্রথম খাবার হিসেবে ভেজালমুক্ত চাল কিনতে চান। আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের আশায় বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতেও রাজি।
বাংলাদেশের বাজারে অর্গানিক নামে বিক্রি হওয়া পণ্যের দামও সাধারণ পণ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। যেমন, ৫০০ গ্রাম অর্গানিক ঘির দাম প্রায় ৭৫০ টাকা, এক লিটার অর্গানিক দুধ প্রায় ৯০ টাকা। আরও অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেই সাধারণ বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দাম নেওয়া হচ্ছে। তবু স্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্যের প্রত্যাশায় ক্রেতারা সেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন কিন্তু এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পণ্যের গায়ে লেখা ‘অর্গানিক’ দাবিটি আসলে কে যাচাই করে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে এমন কোনো কার্যকর সরকারি যাচাই বা বাধ্যতামূলক সনদব্যবস্থা নেই, যা নিশ্চিত করে কোনো খাদ্যপণ্য সত্যিই অর্গানিক কি না। অর্থাৎ, কোনো পণ্যে ‘অর্গানিক’ লেখা থাকলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত বা অনুমোদিত—এমন নিশ্চয়তা ভোক্তার হাতে নেই।
এর অর্থ হলো, কোনো বিক্রেতা চাইলে সাধারণ কৃষিপণ্য বা খাদ্যপণ্য ‘অর্গানিক’ পরিচয়ে বাজারজাত করতে পারেন, যদি না অন্য কোনো আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত সরকারি পরীক্ষা, বাধ্যতামূলক ল্যাব সনদ বা নির্দিষ্ট পরিদর্শনব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
ফলে ভোক্তারা মূলত বিক্রেতার প্রচার, ব্র্যান্ডের পরিচিতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ওপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অথচ স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের ক্রমবর্ধমান এই বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটি স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত যাচাই ব্যবস্থা। নিরাপদ খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি ‘অর্গানিক’ শব্দটির ব্যবহারও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। তবে সেই দাবির পেছনে যদি কার্যকর তদারকি ও সনদব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ভোক্তার আস্থা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়বে, তেমনি প্রকৃত অর্গানিক উৎপাদকরাও ন্যায্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।

