বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আনুষ্ঠানিক কোনো দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া ছাড়াই মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সীমান্তের দুর্গম এলাকা বা রাতের অন্ধকারে কাউকে জোরপূর্বক কিংবা অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে সাধারণত ‘পুশইন’ বা ‘পুশব্যাক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ ধরনের ঘটনার শিকার কত মানুষ বা পরিবার হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি বা বেসরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক নথিভুক্তি, যাচাই-বাছাই বা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে ঘটায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তের বড় অংশ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা হলেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় সীমান্ত অতিক্রম, আটক, গুলি করে হত্যার অভিযোগ এবং জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষকদের অভিযোগ, সীমান্তে কিছু ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হলে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় যাচাই, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানবাধিকার, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে মানুষ স্থানান্তরের অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়াতে পারে।
তারা বলছেন, সীমান্ত সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ সমাধানে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করা। অন্যথায় সীমান্ত ইস্যু দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণা দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের প্রধান লক্ষ্য ছিল পুশইনের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের অভিজ্ঞতা সরাসরি নথিভুক্ত করা। এ সময় ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সীমান্ত পারাপারের পরিস্থিতি, নথিপত্র হারানোর অভিযোগ, সীমান্তে সংশ্লিষ্টদের আচরণ এবং বাংলাদেশে প্রবেশের পর তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
গবেষণার অংশ হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দা, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে দলগত আলোচনাও করা হয়েছে। এসব আলোচনায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার প্রভাব, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ এবং সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা হয়।
এ ছাড়া নারী, শিশু এবং আইনি জটিলতায় পড়া ব্যক্তিদের নিয়ে কয়েকটি বিস্তারিত কেস স্টাডি তৈরি করা হয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব ঘটনা সীমান্তবর্তী মানুষের মানবিক দুর্ভোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এদিকে গত কয়েক সপ্তাহে দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সীমান্তে পুশইনের শিকার বা এমন পরিস্থিতিতে পড়া মানুষের বিভিন্ন চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ প্রতিবেদন, ছবি ও ভিডিওতে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের দুর্ভোগের দৃশ্য উঠে এসেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক সময় এসব মানুষ খোলা আকাশের নিচে, প্লাস্টিকের শিট ব্যবহার করে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে অবস্থান করছেন। একদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) সদস্যদের উপস্থিতির মধ্যে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে সংবাদে উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে খাবার ও পানির সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অনেক ভুক্তভোগী তাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।
গবেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সীমান্তে এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, এর সঙ্গে মানবিক সহায়তা, আইনি প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়ও জড়িত। তারা মনে করেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ ইস্যু নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। ভারতের অনেক মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিছু প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘বাংলাদেশি মুসলিম’ হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টিকে মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই, আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করা প্রয়োজন। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষক।
পুশইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে ভারতের আসামে ‘বিদেশি খেদাও’ আন্দোলনের সময় বিষয়টি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির পরও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকে বিষয়টি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্ব পায়। ১৯৯২ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের সময় ‘অপারেশন পুশ-ব্যাক’ নামে পরিচিত একটি উদ্যোগের সময় বাংলাদেশ এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করে। এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়কে এ ধরনের ঘটনার অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন গবেষকরা। ২০০৩ সালে চিলমারী সীমান্ত এলাকায় কথিত পুশ-ইন চেষ্টাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার এবং ভারতে ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কিছুটা কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়ে। ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ (সিবিএমপি) চালুর পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়।
তবে ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং ২০১৯ সালে আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে বিতর্কের পর সীমান্তে আবারও উদ্বেগ বাড়ে। বিভিন্ন সময় বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি বাড়ায় এবং কয়েকশ ব্যক্তিকে আটক করার খবর পাওয়া যায়।
প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে রয়েছে মতভেদ:
‘পুশইন’ প্রক্রিয়া সাধারণত আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা নথিভুক্ত প্রক্রিয়ার বাইরে ঘটে বলে এর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নির্ধারণ কঠিন বলে মনে করেন গবেষকরা। তবে বিভিন্ন সরকারি তথ্য ও মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর থেকে কিছু সময়ে এ ধরনের ঘটনার প্রবণতা বেড়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সীমান্ত পারাপারের সময় ৯ হাজার ৬১২ জনকে আটক দেখানো হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারি হিসাবের বাইরে আরও অনেক মানুষ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত পার হতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে অভিবাসন, নাগরিকত্ব এবং নিরাপত্তার মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধানে প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর অনুসরণ।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি বাড়ায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এরপর সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় কথিত ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।
গবেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয় সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে এক হাজারের বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি সীমান্ত অঞ্চল উল্লেখযোগ্য।
২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ওই বছরের মে মাসে সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। গবেষকদের হিসাবে, মে মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও ফেনী সীমান্ত এলাকায় এক হাজারের বেশি মানুষকে পুশইনের শিকার হতে হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণায় আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালজুড়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কয়েকশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যও ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতেও সীমান্তে এ ধরনের ঘটনার চেষ্টা অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় কয়েকশ মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি করা হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে তিন ধরনের ভুক্তভোগীর চিত্র:
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২২ জেলার ৫৬টি গ্রামে পরিচালিত সরেজমিন গবেষণায় দেখা গেছে, পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা কোনো একক পরিচয়ের নন। তাদের নাগরিকত্ব, নথিপত্র ও আইনি অবস্থার ভিত্তিতে মূলত তিনটি ভাগে দেখা যায়।
প্রথম শ্রেণিতে রয়েছেন দীর্ঘদিন ভারতে বসবাসকারী নথিবিহীন বাংলাদেশিরা। গবেষণা অনুযায়ী, এদের একটি অংশ কয়েক দশক আগে জীবিকার সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করছিলেন। বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবনের কারণে তাদের কাছে বর্তমান সময়ের প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র বা নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নাও থাকতে পারে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছেন নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও সমস্যায় পড়া ব্যক্তিরা। গবেষকদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ভারতের বৈধ পরিচয়পত্র থাকা ব্যক্তিদেরও সীমান্তে আটক করে নথি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে তারা নিজেদের পরিচয় প্রমাণের ক্ষেত্রে জটিলতার মুখে পড়েছেন।
তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধিত শরণার্থী ছিলেন বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তে আটকে পড়াদের মানবিক সংকট:
সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে পড়া মানুষের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সংকট। অনেক সময় নারী, শিশু ও বয়স্করা দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে অবস্থান করেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ছাড়া পরিচয় ও নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা তাদের সংকট আরও বাড়িয়ে দেয় বলে পর্যবেক্ষকদের মত। একদিকে বিএসএফের নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যদিকে বিজিবির সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় সীমান্ত এলাকায় আটকে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গবেষণায় পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হঠাৎ করে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ভুক্তভোগীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত তৈরি হচ্ছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক দিক বিবেচনা করা জরুরি। তারা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, যাচাই-বাছাইয়ের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির অনুসরণ।
সরেজমিন গবেষণা, স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আইনি নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে গবেষকরা বলছেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে কথিত ‘পুশইন’ ঘটনার পেছনে একাধিক রাজনৈতিক, আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক কারণ কাজ করছে।
গবেষণায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের আসাম রাজ্যের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়েন। গবেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের দাবি, তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেককে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার পর সীমান্তমুখী করার চেষ্টা হয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ করা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ।
পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট ও জম্মু-কাশ্মীরসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ শনাক্তকরণ অভিযানের বিষয়টিও উঠে এসেছে। গবেষকদের অভিযোগ, এসব অভিযানে কখনও কখনও বৈধ নথিপত্র থাকা ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় যাচাই, সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তা ও অবৈধ প্রবেশ ঠেকানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
গবেষণায় ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়টিও আলাদাভাবে উঠে এসেছে। গবেষকদের দাবি, ভারত সরকার অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। এ কারণে ভারতে থাকা কিছু রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের কয়েকটি ঘটনায় বাংলাদেশে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কয়েক দশক আগে জীবিকার সন্ধানে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতে যাওয়া কিছু শ্রমজীবী মানুষও বর্তমানে সমস্যার মুখে পড়ছেন। দীর্ঘদিন বসবাস করলেও অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকায় তারা আইনি জটিলতায় পড়ছেন। গবেষকদের মতে, এসব মানুষকে যথাযথ যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়ে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করানো গ্রহণযোগ্য নয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হলো— বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এ কারণে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তার পাশাপাশি নাগরিকত্ব যাচাই, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত থেকে কথিত পুশইন বা জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়া ব্যক্তিদের সংকট সীমান্ত অতিক্রমের পরও শেষ হয় না। গবেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রবেশের পর এসব মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আইনি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।
২০০৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচন-পূর্ব সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত দিয়ে আসা এসব ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে প্রবেশের পর পরিচয়, নাগরিকত্ব ও আইনি সুরক্ষার সংকটে পড়েছেন বলে সরেজমিন গবেষণায় উঠে এসেছে।
সীমান্ত এলাকায় আটক হওয়া অনেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অবৈধ প্রবেশের অভিযোগে মামলা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও স্থানীয় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় পদক্ষেপ নিয়েছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে আটক হওয়া কিছু ব্যক্তি ও পরিবারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইনের আওতায় মামলা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে কিছু ক্ষেত্রে মামলা ছাড়াই বিজিবি ও পুলিশের সহায়তায় তাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেকেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় অনেকে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি। ফলে কিছু মানুষকে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে কারাগারে থাকতে হয়েছে।
গবেষণায় অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে পরিচয়পত্র ও নাগরিকত্বের সংকট। গবেষকদের দাবি, কিছু ব্যক্তি ভারত থেকে আসার সময় তাদের কাছে থাকা পরিচয়সংক্রান্ত নথি হারিয়েছেন বা নথি নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর নতুন করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মনিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর ফলে তারা এক ধরনের পরিচয় সংকটে পড়ছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে সমাধান না হলে এসব মানুষ দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যেতে পারেন।
পরিচয়পত্র না থাকায় এসব মানুষের অনেকেই আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। জীবিকার তাগিদে অনেকে দিনমজুরি, রিকশা চালানো, ইটভাটা বা গৃহকর্মের মতো অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। গবেষকদের মতে, পরিচয় সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে তাদের কম মজুরি দেওয়া বা অতিরিক্ত কাজ করানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার এবং অন্যান্য আর্থিক সেবায় প্রবেশেও তারা সমস্যায় পড়ছেন।
পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা পেতেও সমস্যায় পড়ছে। ফলে কেউ কেউ বস্তি, রেললাইনের আশপাশ বা প্রত্যন্ত এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে এসব পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো কঠিন হয়ে পড়ে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিচয়পত্র বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
পরিচয়হীনতার কারণে অনেক ভুক্তভোগীর মধ্যে সবসময় গ্রেপ্তার বা হয়রানির ভয় কাজ করে। এ কারণে কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস না করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং স্থানীয় সমাজে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত হতে পারছেন না বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
হঠাৎ করে সীমান্তে এনে ফেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক ভুক্তভোগীর ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ভয়, অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতিকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে আসার পর নতুন সংকটে পড়েছেন। তারা একদিকে শরণার্থী পরিচয়ের সংকট, অন্যদিকে বাংলাদেশে আইনি অবস্থান ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, তাদের আইনি পরিচয়, মানবিক সহায়তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, পরিচয়হীন অবস্থায় দীর্ঘদিন বসবাস করা মানুষদের জন্য কার্যকর সমাধান না হলে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের নাগরিক অন্য দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করলে সাধারণত পরিচয় যাচাই, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়ার ঘটনা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তৈরি করে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত দিয়ে কথিত পুশইনের ঘটনায় উদ্বেগ জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মানবাধিকার কর্মী ও গবেষকদের মতে, সীমান্তে এ ধরনের জটিলতা সমাধানে শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, দুই দেশের মানবাধিকার সংগঠন, গবেষক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পুশইনের প্রকৃত সংখ্যা, ভুক্তভোগীদের পরিচয় এবং তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। এ জন্য দুই দেশের মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধান দল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং একটি নিরপেক্ষ তথ্যভান্ডার তৈরি হলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই বাংলাদেশে প্রবেশের পর আইনি জটিলতায় পড়ছেন। এ অবস্থায় তাদের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরে নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাই সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে দুই দেশের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গবেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, সীমান্তে মানবিক সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা প্রয়োজন। তাদের প্রস্তাব, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বিশেষ করে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সীমান্তের ঘটনাগুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের তথ্য, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান তুলে ধরে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধানের জন্য নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন। তারা বলছেন, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে সীমান্তে মানুষ স্থানান্তরের অভিযোগ, নাগরিকত্ব যাচাই এবং মানবিক সুরক্ষার বিষয়গুলো আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী মানুষের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে যেকোনো সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

