রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক অডিট প্রতিবেদনে কলেজটির বিভিন্ন কার্যক্রমে বিধি লঙ্ঘন, আর্থিক অসঙ্গতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজে কর্মরত ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে সরকারি আইন, নির্ধারিত বিধিমালা ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। পাশাপাশি গত নয় বছরের আর্থিক হিসাব পর্যালোচনায়ও বেশ কিছু অনিয়ম শনাক্ত করেছে অডিট দল।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং নিয়ম অমান্য করে নগদে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাট ও উৎসে আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকার বেশি সরকারি রাজস্ব জমা না দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে গভর্নিং বডির সদস্যদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সম্মানী দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিআইএ এসব ঘটনাকে আর্থিক বিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। অডিট প্রতিবেদনটি পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
১০৫ শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন:
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা সিটি কলেজে বর্তমানে শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ২৮৮ জন। এর মধ্যে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৯৮টি, যেখানে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদও অন্তর্ভুক্ত। এই ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিআইএ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রথম ১০০ জন শিক্ষকের নিয়োগে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। যদিও কিছু ক্ষেত্রে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং সাক্ষাৎকার নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, তবে নিয়োগ কমিটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। এছাড়া, আলাদা নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির বৈধ অনুমোদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও কলেজ কর্তৃপক্ষ অডিট দলের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি ও সাক্ষাৎকার ছাড়াই নিয়োগের অভিযোগ:
ডিআইএর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১০৫ জন শিক্ষকের মধ্যে পাঁচজনের নিয়োগে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অডিট দল মনে করছে, শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ঢাকা সিটি কলেজের নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ডিআইএর এই পর্যবেক্ষণের পর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০৫ জন শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়মের মধ্যে পাঁচজনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। এসব শিক্ষকের মধ্যে রয়েছেন একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং তিনজন সহকারী অধ্যাপক।
ডিআইএর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচজনের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। নেওয়া হয়নি কোনো সাক্ষাৎকারও। এমনকি নিয়োগ কমিটি গঠন কিংবা গভর্নিং বডির অনুমোদনের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। এসব কারণে শিক্ষা আইন ও সরকারি বিধিমালা অনুসরণ না করায় ওই নিয়োগগুলোকে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিআইএ।
অডিট প্রতিবেদনে শিক্ষক পদায়ন ও বেতন-ভাতা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো, এমপিও নীতিমালা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ না করে ঢাকা সিটি কলেজে অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলেজটিতে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ডিআইএ এটিকে বিধিবহির্ভূত ‘স্টাফিং প্যাটার্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ব্যাংকিং নিয়ম ভেঙে নগদে ব্যয় ৭২ লাখ টাকা:
কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে অডিট দল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবরক্ষণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব আয় নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হয় এবং ব্যয় করতে হয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে।
কিন্তু অডিটে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত নয় বছরে ঢাকা সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ না করে নগদ অর্থে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় করেছে। ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যাংকে জমা না রেখে হাতে রেখে ব্যয় করা হলে তা আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের ব্যয়কে প্রতিবেদনে ‘সাময়িক আত্মসাৎ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গভর্নিং বডির সদস্যদের প্রায় দুই কোটি টাকা সম্মানী:
কলেজটির গভর্নিং বডির সদস্যদের সম্মানী গ্রহণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ডিআইএ। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পরিদর্শনের সময় পর্যন্ত গভর্নিং বডির সদস্যরা ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ বা সম্মানী হিসেবে মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা নিয়েছেন।
ডিআইএর মতে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের এ ধরনের সম্মানী গ্রহণের কোনো বিধান নেই। তাই এই অর্থ প্রদানকে বেআইনি ও বিধিবহির্ভূত হিসেবে উল্লেখ করে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভ্যাট-আয়করেও ঘাটতির তথ্য:
অডিটে আরও উঠে এসেছে, ভ্যাট ও উৎসে আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকার বেশি সরকারি রাজস্ব জমা দেওয়া হয়নি। ডিআইএ এসব অনিয়মের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও সুপারিশ করেছে।
ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ডিআইএর এই প্রতিবেদন এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া কলেজটির বিভিন্ন কেনাকাটা, নির্মাণকাজ, আপ্যায়ন, বিজ্ঞাপন, ছাপা ও খেলাধুলা সংক্রান্ত ব্যয়ে নিয়ম অনুযায়ী উৎসে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধের সময় প্রযোজ্য ভ্যাট কাটা হয়নি। এর ফলে সরকার ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সময়ে পাবলিক পরীক্ষার সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রেও উৎসে আয়কর কর্তনের নিয়ম মানা হয়নি। এ খাতে সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকার আয়কর।
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যাট ও আয়কর বাবদ বকেয়া ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকা এবং গভর্নিং বডির সদস্যদের দেওয়া ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি জমা দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে চালানের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, ১৮০ শ্রেণিকক্ষ:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কলেজটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজার ৮১১ জন। প্রায় ৩৯৪ দশমিক ০৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে ১৮০টি শ্রেণিকক্ষ।
তবে পরিদর্শনের সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথি ও একাডেমিক হিসাব অডিট দলের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একাধিক মামলার তথ্য, নেই ব্যয়ের হিসাব:
ঢাকা সিটি কলেজের বিরুদ্ধে চলমান কয়েকটি আইনি জটিলতার কথাও উঠে এসেছে অডিট প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত রিট পিটিশন (মামলা নং-৪৭২/২০১৩), ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির মামলা (মামলা নং-১৯/২৫৮-২০১৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার জালিয়াতি মামলা (মামলা নং-১৩২৫২/২০১৩) এবং নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত দুটি মামলা (মামলা নং-০৭/১৮৫-২০১২ ও ০৬/১৮৪-২০১২)। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব মামলা পরিচালনায় কলেজের তহবিল থেকে কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে, সে সংক্রান্ত কোনো হিসাব বা প্রমাণক অডিট দলকে দিতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব চেয়েছে ডিআইএ:
ঢাকা সিটি কলেজের অনিয়ম তদন্তে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান প্রতিবেদন তৈরি করেন।
ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠিতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং রাজস্ব সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণকসহ ‘ব্রডশিট’ আকারে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, অডিট প্রতিবেদনে ঢাকা সিটি কলেজের নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে, তা সরকারি আইন ও নীতিমালার লঙ্ঘন। কোনো প্রতিষ্ঠানই সরকারি বিধি উপেক্ষা করে পরিচালিত হতে পারে না। শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি অর্থের সঠিক হিসাব ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।
তিনি আরও জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব ও প্রয়োজনীয় প্রমাণক চাওয়া হয়েছে। জবাব পর্যালোচনার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেবে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট

