সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে যে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানে নানা ধরনের অসঙ্গতি ও তথ্যের কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। বাস্তব পরিস্থিতির বদলে অনুমাননির্ভর তথ্য ব্যবহার করে অনেক প্রকল্পকে লাভজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় দেখালেও বাস্তবে এসব প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব তৈরির সময় অনেক ক্ষেত্রে এমন তথ্য ব্যবহার করা হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে সরকার অনেক সময় দুর্বল ও অলাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে সরকারি অর্থের অপচয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে শুধু অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দুর্বলতাই নয়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আরও ১৮টি বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ, ভুল জায়গায় প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন নিশ্চিত না করে প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্পের অর্থে রাজস্ব খাতের ব্যয় পরিচালনা, ক্রয় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং সুপারিশ’ শীর্ষক উপস্থাপনায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শকিল আখতার, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইএমইডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে সাধারণত নেট বর্তমান মূল্য (এনপিভি), অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (আইআরআর) এবং সুবিধা-ব্যয় অনুপাত (বিসিআর) ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য এর অভ্যন্তরীণ আয়ের হার নির্ধারিত ছাড়ের হারের চেয়ে বেশি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই হিসাব পূরণ করতে কৃত্রিমভাবে তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনপিভি, আইআরআর ও বিসিআর নির্ধারণের সময় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি, অর্থের সময়মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক সময় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে অনুমোদনের সময় প্রকল্পকে যতটা লাভজনক দেখানো হয়, বাস্তবায়নের পর তার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে প্রকল্প নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা তৈরি হলে এর দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় রাষ্ট্রকেই।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রকল্পে শুরুতেই নির্ধারিত ফলাফল পরিমাপের জন্য স্পষ্ট সূচক রাখা হয় না। ফলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রকল্প সমাপ্তির পর যে সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান তা যথাসময়ে জমা দেয় না। এতে আগের প্রকল্পের ভুল ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ কমে যায়। একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে পরবর্তী প্রকল্পেও।
উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইএমইডি বলছে, অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সমীক্ষা করা হলেও তা দক্ষ ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না। ফলে প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন, সম্ভাব্য ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না।
কাজ শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে পরিকল্পনার মিল নেই। তখন নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। এতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকা নির্বাচনেও দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতা, ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা না করে অনেক সময় প্রকল্প নেওয়া হয়। ফলে বাস্তবায়নের সময় জমি সংক্রান্ত সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্যান্য জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করতে হয়, যা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি কাজের মানেও প্রভাব ফেলে।

