২০১১ সালে চার মাসের জন্য দেওয়া হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা আদেশ প্রায় ১৫ বছর ধরে বাড়িয়ে আবাসন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওই আদেশ ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল ও স্থানীয় জমির মালিকদের হয়রানি করার অভিযোগও আদালতে তুলে ধরেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
এসব অভিযোগ ও মামলার নথি পর্যালোচনার পর পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের প্রজেক্ট বাস্তবায়নে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) মামলার সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে যে আদেশটি মাত্র চার মাসের জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেটিই পরে সময়ে সময়ে বাড়ানো হয়। এর ফলে একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প দীর্ঘ সময় ধরে আদালতের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের আওতায় নিরাপত্তা সুবিধা পেতে থাকে। রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে এই আদেশের এমন ব্যবহারকে আদালতের আদেশের অপব্যবহার হিসেবে তুলে ধরে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল মামলাটি
প্রবাসীদের অর্থায়নে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় আবাসন ব্যবসা পরিচালনার জন্য পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হয়। মোহাম্মদ মুহিদুর রহমান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং হাবিবুর রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। কোম্পানিটি ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিবন্ধিত হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যার অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট করে। প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া ক্ষমতাবলে প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল কাইয়ুম ওই রিট আবেদন করেন।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পূর্বাচল আমেরিকান সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রূপগঞ্জ ও নরসিংদী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ মোট নয়জনকে বিবাদী করা হয়।
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১১ সালের ২৫ জুলাই হাইকোর্ট নরসিংদী সদর ও রূপগঞ্জ থানার ওসিকে চার মাসের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা রোধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে আইনগত সুরক্ষা দিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে আইনগতভাবে বাধা সৃষ্টি বন্ধে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়।
চার মাসের আদেশ কীভাবে ১৫ বছরে গড়াল
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উঠে আসে রাষ্ট্রপক্ষের জবাবে।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, চার মাসের জন্য দেওয়া ওই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ পরবর্তী সময়ে বারবার বাড়ানো হয়েছে। এভাবে প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি ওই আদেশের সুবিধা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য দেওয়া আদালতের আদেশ দীর্ঘদিন ধরে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূল রিটের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অর্থাৎ, যে আদেশের উদ্দেশ্য ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা দূর করা ও আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দীর্ঘ সময় ধরে সেটিই প্রকল্পের পক্ষে একটি কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে এমন চিত্র তুলে ধরে।
প্রকল্পের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন
রাষ্ট্রপক্ষ শুধু নিরাপত্তা আদেশের ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি। প্রকল্পটির আইনগত অনুমোদন ও নিবন্ধন নিয়েও গুরুতর বিতর্ক রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্প হলেও এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের একটি মামলায় আসামি হওয়ার বিষয়টিও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য ছিল, ওই মামলায় তাঁরা যথাক্রমে ১ ও ৫১ নম্বর আসামি। এরপরও ২০১১ সালের হাইকোর্টের আদেশ ব্যবহার করে প্রকল্পটি নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে আসছিল।
জমি দখল ও জাল নথির অভিযোগ
শুনানিতে প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে জমি দখল ও জালিয়াতির অভিযোগও তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ।
তাদের দাবি, জালিয়াতি ও মিথ্যা নথির মাধ্যমে কয়েকটি মৌজায় কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলেও আদালতকে জানানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও অভিযোগ করে, ২০১১ সালের রিটে দেওয়া প্রাথমিক আদেশকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ভুলভাবে ব্যবহার করে একই মৌজার স্থানীয় জমির মালিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে উপস্থাপিত বক্তব্য ও মামলার জবাবের অংশ; রায়ে আদালত অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও স্পষ্ট হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তি ছিল আদালতের আদেশের ব্যবহার নিয়ে
মামলার ৯ নম্বর বিবাদী রূপগঞ্জ থানার ওসির পক্ষে উপপরিদর্শক আহসান হাবিব আদালতে জবাব দাখিল করেন। গত ১৬ জুলাই দাখিল করা ওই জবাবে রিটকারীর সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়।
তবে শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ মূলত একটি প্রশ্ন সামনে আনে—একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ কি বছরের পর বছর ব্যবহার করা যেতে পারে?
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, চার মাসের আদেশ প্রায় ১৫ বছর ধরে বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানটি আদালতের আদেশের সুবিধা নিয়েছে এবং সেটি ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত রুল খারিজ
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে হাইকোর্ট পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবিরসহ অন্যরা। রিটকারীর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির বলেন, রিটকারী প্রতিষ্ঠান চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ নিয়ে সেটি প্রায় ১৫ বছর ধরে বাড়িয়েছে। এই সময়ে তারা নিরাপত্তা দেওয়ার আদেশের অপব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক একটি মামলার আসামি হওয়ার পরও হাইকোর্টের ওই আদেশ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এসব বিষয় আদালতের সামনে তুলে ধরার পর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দিয়েছেন।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশক ধরে চলা ওই রিটে বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের পক্ষে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা আদেশের ব্যবহার নিয়ে আইনি বিতর্কেরও অবসান হলো।

