ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কিশোরী গৃহকর্মী মীম আক্তারের মরদেহ ফেলে যাওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন আসামিকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তিন আসামি হলেন—মীমের গৃহকর্তা ফয়সাল আহমেদ (৩৫), তাঁর স্ত্রী রাহেমা খাতুন রেশমা (২৯) এবং রেশমার বাবা এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক (৪৭)।
তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাঁদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। এদিন আসামিদের পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপপরিদর্শক শাহ আলম।
যেভাবে মিলল মীমের পরিচয়
গত ১২ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে এক কিশোরীর মরদেহ রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করে। ২০ আগস্ট মীমের পরিবার জানতে পারে, তাঁর মরদেহ ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পুলিশের সহায়তায় সেখানে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
মীম আক্তার (১৫) কুমিল্লার বাসুদেব বাজার এলাকার ফজলু মিয়ার মেয়ে। প্রায় এক বছর ধরে তিনি ফয়সাল আহমেদের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন।
মীমের পরিবারের অভিযোগ, ওই বাসায় কাজ শুরু করার পর থেকেই তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। ফোনে পরিবারের সদস্যদের কাছেও নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন মীম। এরপর তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় পরিবার।
এর মধ্যেই ঢামেক হাসপাতালের সামনে তাঁর মরদেহ রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
মৃত্যুর পর পরিবারকে কী বলা হয়েছিল
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট ফয়সাল আহমেদ মীমের পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, মীম বাসা থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে অন্য এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন।
পরিবারের সদস্যরা ১৭ আগস্ট ফয়সালের বাসায় গিয়ে মীমের খোঁজ করেন। এ সময় তাঁদের গালিগালাজ করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর ২০ আগস্ট পরিবার জানতে পারে, মীমের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
২১ আগস্ট হত্যা মামলা
মরদেহ শনাক্তের পরদিন, ২১ আগস্ট মীমের মা শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফয়সাল আহমেদ, রাহেমা খাতুন রেশমা ও এ বি এম আব্দুর রাজ্জাককে আসামি করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মাহফুজা আক্তার ২৪ আগস্ট তিন আসামির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাঁদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, মীম আত্মহত্যা করেছিলেন।
তবে মীমের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে এবং পুলিশ তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করেছে।
এখন তদন্তে গুরুত্ব পাবে মৃত্যুর কারণ
রিমান্ড শেষে তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানো হলেও মীমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং কী পরিস্থিতিতে তাঁর মরদেহ ঢামেক হাসপাতালের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
বিশেষ করে মীমের মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, পরিবারের কাছে করা কথিত নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা কতটা, মৃত্যুর ধরন কী এবং মরদেহ হাসপাতালের সামনে রেখে যাওয়ার সঙ্গে আসামিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।
আদালতে আসামিপক্ষের পক্ষ থেকে আত্মহত্যার দাবি করা হলেও মামলাটি এখনো বিচারাধীন। তাই তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

