রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে আট বছরের মাদরাসাছাত্র মুদাচ্ছির হত্যা মামলায় হাফেজ মোহাম্মদ উল্যাহকে জামিন দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার ১৫তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মিজানুর রহমান শুনানি শেষে এক হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত এ জামিন বহাল থাকবে।
মোহাম্মদ উল্যাহ মুদাচ্ছির হত্যা মামলার তিন আসামির একজন। মামলা হওয়ার প্রায় দুই মাস পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।
তবে ছেলের হত্যা মামলায় এক আসামির জামিনের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন মুদাচ্ছিরের বাবা জিয়াউর রহমান। তিনি আদালতে জামিনের বিরোধিতা করতেও উপস্থিত ছিলেন।
মামলার এজাহার ও আদালতে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, গত বছরের ২০ ডিসেম্বর বিকেলে কুতুবখালীর মাদরাসাতুল ইতকান লি উলুমিল কোরআনের চতুর্থ তলার শিক্ষকদের টয়লেট থেকে মুদাচ্ছিরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় গামছা পেঁচানো ছিল।
পরদিন মুদাচ্ছিরের বাবা জিয়াউর রহমান তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন মাওলানা কারি আনিছুর রহমান ও শিক্ষক ইনচার্জ হাফেজ মাওলানা জহিরুল ইসলাম।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, মুদাচ্ছিরের সঙ্গে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল অথবা সে কোনো ঘটনা দেখে ফেলেছিল—এমন কোনো কারণে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এজাহারে বলা হয়, ২০ ডিসেম্বর বিকেল সোয়া ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে তিন আসামিসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজন তাকে হত্যা করে থাকতে পারেন।
বাদীপক্ষের আরও অভিযোগ, হত্যার ঘটনা আড়াল করতে মুদাচ্ছিরের মরদেহ শিক্ষকদের টয়লেটের ভেন্টিলেশনের সঙ্গে গামছা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
জামিন আবেদনে আসামিপক্ষের বক্তব্য
জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আবুল কালাম খান। তিনি আদালতে দাবি করেন, মোহাম্মদ উল্যাহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মোহাম্মদ উল্যাহ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি উল্লেখ করে তার দীর্ঘদিনের কারাবন্দিত্বে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে বলেও আদালতকে জানান আইনজীবী। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো শর্তে জামিন দেওয়ার আবেদন করা হয়।
জামিনের বিরোধিতা বাদীপক্ষের
তবে জামিনের বিরোধিতা করেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ও বিডিআর বিদ্রোহ মামলার প্রধান প্রসিকিউটর আলহাজ বোরহান উদ্দিন।
তিনি আদালতে বলেন, মাদরাসার ভিডিও ফুটেজে ঘটনার দিন বিকেলেও মুদাচ্ছিরকে স্বাভাবিক ও প্রাণচঞ্চল অবস্থায় দেখা যায়। এরপর শিক্ষকদের টয়লেট থেকে তার গলায় গামছা পেঁচানো মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি রহস্যজনক বলে দাবি করেন তিনি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আরও দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে আসামিদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের আগে মোহাম্মদ উল্যাহকে জামিন না দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত এক হাজার টাকা মুচলেকায় মোহাম্মদ উল্যাহর জামিন মঞ্জুর করেন।
‘আমার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না’
আদালত থেকে জামিনের খবর পাওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুদাচ্ছিরের বাবা জিয়াউর রহমান। তার দাবি, তার আট বছরের ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না।
জিয়াউর রহমান বলেন, মুদাচ্ছির মশারির দড়িও নিজে বাঁধতে পারত না। তার দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় গামছায় যে ধরনের গিঁট দেওয়া ছিল, তা একজন শিশুর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।
মামলার অন্য দুই আসামি এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায়ও ক্ষোভ জানান তিনি। তার অভিযোগ, ওই দুই আসামি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করছে না।
মামলাটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন। কারণ, শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড এবং এ ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

