সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে গিয়ে চোখে পড়ে এক ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন—বাসায় মেহমান এসেছে অথচ চুলায় গ্যাস নেই, এমন সমস্যার সমাধান নাকি মিলবে ছোট্ট একটি যন্ত্রেই, যা গ্যাসের চাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে। রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকটকে পুঁজি করে এভাবেই অনলাইনে রমরমা ব্যবসা চলছে অবৈধ গ্যাস কম্প্রেসর বা বুস্টারের, অথচ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী সংস্থার কার্যকর নজরদারি এখনো সীমিত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুকের অন্তত ত্রিশটি পেজে এসব যন্ত্র বিক্রি হচ্ছে, পাশাপাশি জনপ্রিয় অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মেও এসব পণ্যের সন্ধান মিলেছে। বিক্রেতাদের কেউ কেউ দেড় থেকে দুই বছর ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। দাম রাখা হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে, সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে এক বছর পর্যন্ত গ্যারান্টি বা সার্ভিস সুবিধা।
বিজ্ঞাপনগুলোতে এসব যন্ত্রকে কখনো গ্যাস প্রেশার বুস্টার, কখনো গ্যাস কম্প্রেসর, আবার কখনো গ্যাস পাম্প নামে প্রচার করা হচ্ছে। রান্নার সময়ের ভিডিও দেখিয়ে বা আগুনের তীব্রতা প্রদর্শন করে গ্রাহক আকৃষ্ট করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। বিক্রেতারা সাধারণত ক্রেতার কাছে প্রথমেই জানতে চান, বাসার লাইনে গ্যাস একেবারেই না থাকে নাকি অল্প পরিমাণে আসে—কারণ লাইনে গ্যাসের অস্তিত্ব একেবারে না থাকলে এসব যন্ত্র কাজ করে না বলে তাঁরা জানান।
গ্রাহক পরিচয়ে কথা বললে একজন বিক্রেতা জানান, দৈনিক তাঁদের একশ থেকে দেড়শটি পণ্য বিক্রি হয়, যার বড় অংশই যাচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়। তিনি জানান, লাইনে মাঝেমধ্যে গ্যাস এলেই কেবল যন্ত্রটি কার্যকর হয়, পুরোপুরি গ্যাসশূন্য অবস্থায় এটি কোনো কাজে আসে না।
আরও জানা যায়, শুরুর দিকে বাজারে থাকা একটি পুরোনো মডেলে বেশি শব্দ ও কম্পনের সমস্যা থাকায় বিক্রেতারা এখন নতুন মডেলের দিকে ঝুঁকেছেন, যেখানে এসব সমস্যা কিছুটা কমানোর দাবি করা হচ্ছে। এসব যন্ত্র মূলত চীন থেকে আমদানি করা হলেও এর সরবরাহ প্রক্রিয়া বা মূল আমদানিকারকদের পরিচয় সম্পর্কে বিক্রেতারা বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি।
গ্যাস সরবরাহকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, গ্যাসলাইনে এ ধরনের বুস্টার বা কম্প্রেসর ব্যবহারের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অননুমোদিত যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই, কারণ এতে আশপাশের অন্য গ্রাহকদের স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
তাঁর ভাষ্যমতে, শিল্পকারখানায় বড় আকারের কম্প্রেসর ব্যবহারের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা পেয়ে আসছেন এবং বিভিন্ন অভিযানে এসব যন্ত্র জব্দও করা হয়েছে। তবে আবাসিক পর্যায়ে ঠিক কতগুলো কম্প্রেসর এ পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি তিনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি নজরে আসার কথাও জানান তিনি, এবং এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।
তবে শুধু ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই যে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না, তা স্বীকার করেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। এ কারণে তারা সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করেছে, যাতে এসব যন্ত্র দেশে আমদানির পথই বন্ধ করে দেওয়া যায়। সংস্থার ওই কর্মকর্তার মতে, বাজারে পণ্য সহজলভ্য থাকলে প্রতিটি ব্যবহারকারীকে আলাদাভাবে খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া কার্যত অসম্ভব একটি কাজ, তাই মূল উৎসেই এই আমদানি বন্ধ করা জরুরি।
তিতাসের ভাষ্যমতে, এই যন্ত্র ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া। একই লাইনে সংযুক্ত অন্য গ্রাহকরা এর ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ ছাড়া এসব যন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণের কোনো দায়িত্ব যেহেতু তিতাসের হাতে নেই, তাই দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থেকে যায়। যদিও বিক্রেতারা দাবি করেছেন, তাঁদের বিক্রি করা পণ্য নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার খবর তাঁরা পাননি, তবে গ্যাসলাইনে পানি জমে থাকলে বা বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামা করলে যন্ত্র বিকল হওয়ার অভিযোগ কিছু ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া গেছে বলে স্বীকার করেছেন তাঁরা।
চলতি বছরের নতুন গ্যাস বিপণন নিয়মাবলিতে অননুমোদিত সরঞ্জাম বা বুস্টার ব্যবহারকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তিতাস। আগে এ ধরনের ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপের বিধান থাকলেও নতুন নিয়মে এটিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও আদায় প্রক্রিয়াও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। সংস্থার ওই কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত অভিযানে কম্প্রেসর জব্দ করা অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন বিধি অনুযায়ী অননুমোদিত সরঞ্জাম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্যাস সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই এ ধরনের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমাধানের প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যন্ত্র বিক্রি হতে থাকায় শুধু মাঠপর্যায়ের অভিযান দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই প্রবণতা রোধ করা কঠিন হবে। পাশাপাশি মূল সমস্যা, অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি দূর করা না গেলে গ্রাহকদের মধ্যে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প ব্যবহারের প্রবণতা অব্যাহত থাকারই আশঙ্কা বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

