স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু পরপর দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনা আবারও সামনে এনেছে পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ বাস্তবতা।
সম্প্রতি রাজধানীতে মুক্তা ইসলাম নামে এক নারীকে স্বামীর মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁকে বেল্ট দিয়ে মারধর করা হচ্ছে। পাশে থাকা ঘর থেকে সন্তানদের কান্নার শব্দও শোনা যায়।
মুক্তার মৃত্যুর পর জানা যায়, নির্যাতনের ওই ভিডিও তাঁর স্বামী নিজেই তাঁর ভাইকে পাঠিয়েছিলেন। কয়েক দিন পর আরেক নারী আল মাইদা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায়ও সামনে আসে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগ।
মাইদার মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি খালাতো বোনকে নিজের আহত মুখের ছবি পাঠিয়েছিলেন। ছবিতে তাঁর চোখ ফোলা ছিল। গালে ব্যান্ডেজও দেখা যায়। সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’
সন্তানদের কথা ভেবে সংসার ছাড়েননি
২০ বছর বয়সী মাইদার বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে। ২০২১ সালে প্রেমের সম্পর্ক থেকে সিয়াম আল মুরসালিন আকাশের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
তাঁদের দুটি সন্তান। একজনের বয়স চার বছর, অন্যজনের মাত্র এক বছর।
মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই স্বামীর হাতে মারধরের শিকার হতেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে একবার পারিবারিক সালিসও হয়েছিল। তখন সিয়াম বিষয়টিকে স্বামী-স্ত্রীর সাধারণ ঝামেলা হিসেবে দেখিয়েছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
মাইদার খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়া জানান, মাইদা তাঁকে প্রায়ই স্বামীর মারধরের কথা বলতেন।
মৃত্যুর দুই দিন আগে আহত অবস্থার ছবি পাঠিয়ে মাইদা তাঁকে জানান, সেদিনও তাঁকে মারধর করা হয়েছে।
শাফিয়া তাঁকে সংসার ছেড়ে চলে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু মাইদা সন্তানদের কথা ভেবে তা করতে চাননি বলে জানান তিনি।
হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পালিয়ে যান স্বামী
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে সিয়াম মাইদার মাকে ফোন করে জানান, মাইদা অসুস্থ হয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছেন।
মা হাসপাতালে গিয়ে মেয়েকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। পরিবারের অভিযোগ, সিয়াম তখন হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছিলেন।
মেয়েকে হত্যার অভিযোগে শুক্রবার পলাশবাড়ী থানায় মামলা করেন মাইদার মা মোছা. রহিমা খাতুন। মামলায় সিয়ামসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
তবে সিয়ামের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশের কাছে তিনি দাবি করেছেন, বিকেলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মারামারি হয়। পরে মাইদা ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেন।
তাঁর দাবি, কয়েকজন বন্ধু মিলে মাইদাকে ফ্যান থেকে নামিয়ে আনেন। এরপর তিনি মাইদাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
পলাশবাড়ী থানার ওসি সারওয়ার আলম খান জানান, মাইদার গলায় দাগ পাওয়া গেছে। শরীরের কয়েক জায়গায় পুরোনো আঘাতের চিহ্নও ছিল।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
মুক্তার মৃত্যুতেও নির্যাতনের অভিযোগ
মাইদার ঘটনার আগে রাজধানীর খিলক্ষেতে মুক্তা ইসলাম নামে আরেক নারীর মৃত্যু হয়।
৩ সেপ্টেম্বর একটি বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদার তাঁর ভাই তানভীর রহমানের কাছে একটি ভিডিও পাঠিয়েছিলেন। সেখানে মুক্তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে মারধর করতে দেখা যায়।
পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী উঠে এসেছে, তা এই ঘটনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগই বেশি
নারী নির্যাতনের ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে আসা কলের হিসাবেও স্বামীর হাতে নির্যাতনের চিত্র স্পষ্ট।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগে ২৭ হাজার ৯১১টি কল এসেছে।
এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১৭ হাজার ১৯৬টি। অর্থাৎ মোট কলের প্রায় ৬২ শতাংশই এসেছে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে।
হিসাব অনুযায়ী, এই আট মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০টি কল এসেছে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগে।
গত বছরও নারী নির্যাতনের অভিযোগে আসা কলের প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে।
সহিংসতাকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা
নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের যৌথ জরিপেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় স্বামী বা জীবনসঙ্গীর হাতে শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
জরিপের আগের ১২ মাসে এমন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪১ শতাংশ নারী।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতাকে অনেক সময় অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। বরং সংসার টিকিয়ে রাখার নামে নারীকে নির্যাতন সহ্য করতে বলা হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পারিবারিক সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। তবে অভিযোগ করা নারীদের নিয়েও নানা ধরনের অপপ্রচার হয়। এতে ভুক্তভোগীরা বিচার চাইতে আরও পিছিয়ে যান।
মামলা হলেও বিচার নিয়ে প্রশ্ন
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১৯টি ঘটনায় মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই সময়ে স্বামীর হাতে ১০৮ নারী নিহত এবং ২২ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
গত বছর সংবাদমাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে মামলা হয়েছিল ২৪৮টি ঘটনায়। ওই বছর স্বামীর হাতে ২১৭ নারী নিহত এবং ২৮ নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক মনে করেন, শুধু আইন করলেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
তাঁর মতে, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে পরিবার ও সমাজের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, অপরাধের বিচার না হলে অভিযুক্তদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায়। এতে সহিংসতাও বাড়তে পারে।
মাইদার মৃত্যুর পর তাঁর দুই সন্তান এখন নানির কাছে। পরিবারের দাবি, ছোট সন্তানটি মায়ের দুধের জন্য এখনো কাঁদছে।
একদিকে একটি পরিবারের দুই শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মাইদার মা মেয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার চাইছেন।
এই দুই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলছে, সংসারের ভেতরের নির্যাতনকে আমরা আর কত দিন ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখব?

