রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলম তার চেয়ারে বসে একজন প্রবাসীকে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা শুধু একজন কর্মকর্তার দুর্নীতির ঘটনা নয়, এটি সরকারি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ, যেখানে সাধারণ মানুষ সেবা পেতে বাধ্য হচ্ছেন ঘুষ দিতে।
ভুক্তভোগী রাসেল মোল্লা জানিয়েছেন, তিনি বাহরাইন প্রবাসী। ছুটিতে বাড়িতে এসে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করতে গেলে নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলম তার কাছে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। রাসেল বলেন, ‘আমি উনাকে কাকুতি-মিনতি করে দুই হাজার টাকা দিই।’ তিনি আরও জানান, তিনি ব্রেন টিউমারে অসুস্থ ছিলেন। এই কথা বলার পরও নির্বাচন কর্মকর্তা নানা অজুহাতে তাকে তিন-চার দিন ঘুরিয়েছেন। পরে টাকা দিতে রাজি হলে ভোটার আইডি করে দেন। রাসেলের অভিযোগ, ‘শুধু আমি নই। কোনো ব্যক্তিই নির্বাচন অফিসে টাকা ছাড়া সেবা পান না। এই অফিসের প্রত্যেক লোক টাকা খায়। টাকা না দিলে কুকুরের মতো ব্যবহার করে।’
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নির্বাচন অফিসের দুর্নীতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ যাওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ভোটার আইডি করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আপনি টাকা দেবেন, কাজ হবে। টাকা না দিলে আপনাকে আইনের প্যাঁচে ফেলে মাসের পর মাস ঘুরাবে।’ এই বক্তব্য প্রমাণ করে, ঘুষ নেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই অফিসে বছরের পর বছর ধরে ঘুষ বাণিজ্য চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, যারা টাকা দিতে পারে না বা দিতে চায় না, তাদের হয়রানি করা হয়। আইনের ভয় দেখিয়ে তাদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করানো হয়।
ঘটনার পর নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’ গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল হুদা জানিয়েছেন, নির্বাচন অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তারা খবিরুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। রাজবাড়ী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন বলেছেন, ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনাটি তারা জানতে পেরেছেন এবং তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফরিদপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাহাবুব আলম শাহ্ জানিয়েছেন, খবিরুল আলমকে শোকজ করা হয়েছে এবং আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাকে জবাবদিহি করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন অফিস কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। যে-ই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে প্রশ্ন হলো, শুধু শোকজ আর তদন্তের আশ্বাস দিলেই হবে না, এই ধরনের ঘটনার মূল কারণ কী? সরকারি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের মূল কারণ হলো জবাবদিহিতার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং শাস্তির ভয় না থাকা। একজন নির্বাচন কর্মকর্তা যদি অফিসে বসেই প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে পারেন, তাহলে বোঝা যায়, তদারকি ব্যবস্থা কার্যত অচল।
এই ঘটনা নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তির জন্যও বড় ধাক্কা। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা যখন ঘুষ নেন, তখন সাধারণ মানুষের নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা কমে যায়। ভোটার আইডি কার্ড একটি মৌলিক অধিকার, যা পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হলে সেটি সংবিধান ও আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ভুক্তভোগী রাসেল মোল্লা একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তার ভাষায়, ‘আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে দুর্নীতিবাজ নির্বাচন কর্মকর্তার শাস্তি দাবি করছি।’ এই দাবি শুধু রাসেলের নয়, গোটা দেশের সাধারণ মানুষের। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে খবিরুল আলমের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং এই অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের চিরচেনা সংস্কৃতি বন্ধ হয় কিনা।

