দেশের ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূত বেতন-ভাতা ও সম্মানী দেওয়া থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ, কেনাকাটা, ভর্তি ফি, সরকারি রাজস্ব, ভ্যাট, পদোন্নতি, অতিরিক্ত সুবিধা এবং চুক্তি বাস্তবায়ন—বিভিন্ন খাতে মোট ১৩২টি অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৩০ টাকা।
বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত এই নিরীক্ষা পরিচালনা করে। যাচাই করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব ও আর্থিক কার্যক্রম। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
নিরীক্ষার ফলাফল শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আর্থিক ভুলের কথা বলছে না। পুরো প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনায় নিয়ম মানা, অনুমোদন নেওয়া, সরকারি অর্থের হিসাব রাখা এবং দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিদ্ধান্ত সরকারি বিধি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনা কিংবা অনুমোদিত জনবলকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যেসব অর্থ অনিয়মিতভাবে ব্যয় হয়েছে বা সরকারের ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো আদায়ের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগই বলছে, নিরীক্ষায় ওঠা ঘটনাগুলো বর্তমান প্রশাসনের আগের সময়ের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংশ্লিষ্ট দপ্তর এসব আপত্তির জবাব ও পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগও জানিয়েছে, নিরীক্ষা আপত্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাদের ব্যাখ্যা দেবে। সেই ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পর প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ফেরত, আপত্তি নিষ্পত্তি অথবা অন্য ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই নিরীক্ষার আওতায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে কয়েকটিতে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। অন্যদিকে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬টি। সেই হিসাবে ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষায় এত বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম উঠে আসা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নিরীক্ষায় সবচেয়ে বড় অঙ্কের আপত্তি এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে। সেখানে অনিয়মিত ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৯৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার টাকা। এত বড় উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বিধি এবং অর্থ ব্যয়ের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটি নিরীক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।
আরেকটি বড় আপত্তি তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের জনবল পৃথকভাবে শনাক্ত না হওয়ার কারণে। এতে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ের যথার্থতা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১২০ কোটি ৫৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে যথাযথ ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করার কারণে ৪১৬ কোটি ৪৩ লাখ ২১ হাজার টাকার ব্যয় অনিয়মিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এসব বড় খাত মিলিয়ে শুধু এই অংশেই অনিয়মের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি।
অর্থাৎ মোট অনিয়মের বড় অংশই কয়েকটি উচ্চমূল্যের নির্মাণ, হিসাবরক্ষণ ও অর্থ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত ঘটনায় কেন্দ্রীভূত। তবে প্রতিবেদনের অন্য অংশগুলো দেখলে বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু বড় উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, নিয়োগ, পদোন্নতি, আবাসন সুবিধা, মোবাইল ও টেলিফোন সুবিধা, ভর্তি ফি এবং অতিরিক্ত ভাতাসহ দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমেও একের পর এক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে বা দেশের ভেতরে উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মস্থলে যোগদান না করা শিক্ষকদের কাছ থেকে ছুটিকালীন বেতন-ভাতা ফেরত না নেওয়ার ঘটনাও নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। এই খাতে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি টাকা। কোনো শিক্ষক নির্দিষ্ট শর্তে শিক্ষা ছুটি নিয়ে পরে প্রতিষ্ঠানে ফিরে না এলে চুক্তি বা বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও একাধিক ক্ষেত্রে তা করা হয়নি বলে নিরীক্ষায় আপত্তি উঠেছে।
একইভাবে অনুমোদিত জনবলকাঠামোর বাইরে পদোন্নতি দিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়ার কারণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। অর্গানোগ্রাম-বহির্ভূত পদে পদোন্নতি দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৭ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৮ টাকা।
এই ধরনের অনিয়ম শুধু অর্থের ক্ষতি তৈরি করে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য এবং প্রশাসনিক অসামঞ্জস্যও তৈরি করতে পারে। অনুমোদিত পদ ও কাঠামোর বাইরে পদোন্নতি হলে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরির সুযোগ, পদোন্নতি ও সুবিধা নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করেও কিছু ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও নিরীক্ষায় পাওয়া গেছে। এসব নিয়োগের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা বাবদ ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৪ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগেও নিয়মের ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। ১২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জন্য এমন একটি ভাতা দেওয়া হয়েছে, যার সুযোগ সংশ্লিষ্ট বিধিতে নেই বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এক অর্থবছরে এই খাতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি ৭ কোটি টাকার বেশি।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের আপত্তি রয়েছে। অবসর গ্রহণের বয়স বিধিবহির্ভূতভাবে ৫৯ বছরের বেশি ধরে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা এবং ছুটি নগদায়নের সুবিধা দেওয়ায় ২১ কোটি ৯২ লাখ ৩৭ হাজার ১৪ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় আবাসনে বসবাসকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারের চেয়ে কম বাড়ি ভাড়া কর্তনের ঘটনাও নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। এই খাতে প্রতিবেদনে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ২০ কোটি ৪২ লাখ ১৭ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।
শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও মোবাইল ভাতা দেওয়ার কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৮৮ টাকা। টেলিফোন বিল নগদায়ন ভাতা দেওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৮ টাকা।
শিক্ষকদের প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার কারণেও অর্থ ব্যয় হয়েছে। এ ধরনের অতিরিক্ত ভাতা বাবদ ক্ষতি ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৪ টাকা। আবার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি বই ভাতা দেওয়ার কারণে ১৯ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭৭ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাল ভাতা দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি রয়েছে। এই খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৩ হাজার ৫৩৪ টাকা।
নিরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভর্তি কার্যক্রমের অর্থ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ভর্তি ফরম বিক্রি এবং ভর্তি ফি থেকে পাওয়া অর্থ বাজেটে না দেখানোর কারণে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৬ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় বাজেটের বাইরে থাকলে অর্থের প্রকৃত প্রবাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আয় কত, কোথায় জমা হয়েছে এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে—এসব প্রশ্নে স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
শুধু ভর্তি থেকে পাওয়া অর্থ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া আয়ও বাজেটে না দেখানোর ঘটনা শনাক্ত করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এই ধরনের অনিয়মের কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৪ কোটি ৯১ লাখ ৩৮ হাজার ১৬৫ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেট থেকে দেওয়া নিয়েও আপত্তি উঠেছে। এই খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৫ টাকা।
নির্মাণ ও ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে সময়সীমা মানা এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন পাওয়া গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করার পরও ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা আদায় না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫৮ কোটি ৪০ লাখ ৫২ হাজার ১৯৭ টাকা।
এই তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি বা সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত নির্মাণকাজে সময়মতো কাজ শেষ না হলে চুক্তি অনুযায়ী জরিমানা আদায়ের বিধান সাধারণত অর্থের সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সেই ব্যবস্থা কার্যকর না হলে প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থও ঝুঁকিতে পড়ে।
নিরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পদোন্নতির ঘটনাও পাওয়া গেছে। কোথাও বাজেট অনুমোদনের সীমা অতিক্রম করে ব্যয় হয়েছে, কোথাও বিভিন্ন বিল থেকে প্রযোজ্য ভ্যাট কর্তন করা হয়নি।
কিছু ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের চুক্তির বাইরে অর্থ দেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ, সংশ্লিষ্ট সেবা এবং প্রতিস্থাপন কাজেও অনিয়মিত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। আবার নিম্নমানের মূল উত্তরপত্র ও পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হলেও তার বিপরীতে অর্থ পরিশোধের ঘটনা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসেছে।
এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেখা যায়, অনিয়মগুলোর ধরন মোটামুটি তিনটি বড় সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। প্রথমত, অনুমোদনের বাইরে অর্থ ব্যয় বা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্য আয় ও সরকারি রাজস্ব যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত বা জমা করা হয়নি। তৃতীয়ত, ক্রয়, নির্মাণ ও চুক্তি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সব ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, কমিশন আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচিত অনিয়মগুলো বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ের হলেও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরীক্ষা আপত্তি নিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপত্তি থাকলে অর্থছাড়সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও বিষয়টিকে জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, সরকারি অর্থের অপব্যবহারের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অনেকে প্রকাশ্যে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে চাননি। তাঁদের একটি সাধারণ অবস্থান হলো, নিরীক্ষায় যে সময়ের অনিয়মের কথা এসেছে, তার বড় অংশ তাঁদের দায়িত্ব নেওয়ার আগের। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁরা দায়িত্বে এসেছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নিরীক্ষা আপত্তির জবাব দেওয়ার কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা পরিচালনা করবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর তাৎক্ষণিকভাবে জানা ছিল না এবং তিনি খোঁজ নেবেন।
২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিরীক্ষা তাই শুধু অতীতের ব্যয় নিয়ে হিসাবের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক স্বাধীনতা, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়নের বিষয়ও জড়িত।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। ফলে শিক্ষক নিয়োগ থেকে ভবন নির্মাণ, ভর্তি ফি থেকে গবেষণা ব্যয়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থ ব্যবহারের স্পষ্ট হিসাব থাকা জরুরি। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণায় প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হয়, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে আর্থিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হয়।
নিরীক্ষায় ওঠা প্রতিটি আপত্তি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাব, প্রয়োজনীয় নথি এবং পরবর্তী নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। তবে ১৩২টি ঘটনায় ২ হাজার ৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৩০ টাকার প্রশ্ন ওঠা নিঃসন্দেহে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার আর্থিক তদারকি নিয়ে বড় সতর্কসংকেত।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরীক্ষা প্রতিবেদন শুধু কাগজের আপত্তি হয়ে থাকবে কি না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথাযথ নথি ও ব্যাখ্যা দিয়ে আপত্তি নিষ্পত্তি করবে, নাকি অনিয়মিতভাবে ব্যয় হওয়া অর্থ ফেরত আদায় এবং দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে—সেটিই সামনে নজরে থাকবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করা, আয় ও ব্যয়ের তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনুমোদিত কাঠামো অনুসরণ করা এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক তদারকি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সমস্যা নয়; এটি সরকারি অর্থ ব্যবহারের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

