ওষুধের প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে সৌদি আরবে পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা, আর এই কাজে না জেনেই বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকেরা। চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় পরপর দুটি চালান ধরা পড়ার পর প্রকাশ্যে এসেছে এমনই একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের তথ্য।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুই দফা অভিযানে মোট ৫২০টি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। চক্রের মূল হোতা হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন শাহরাস্তির তিন বাসিন্দা। তাঁদের একজন বর্তমানে দেশে থাকলেও বাকি দুজন অবস্থান করছেন সৌদি আরবে। পুলিশের তথ্য এবং একাধিক কথোপকথনের অডিও রেকর্ড বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এই তিনজন বিভিন্ন সময় সৌদিপ্রবাসীদের কাছ থেকে মাদকের চালান সংগ্রহ করে আসছেন।
চক্রটির কৌশল অনেকটা একই ধাঁচের। প্রথমে সৌদিগামী কোনো যাত্রীকে চিহ্নিত করে পরিচিত বা এলাকার মানুষ হিসেবে যোগাযোগ করা হয়। এরপর সৌদি আরবে ওষুধের দাম বেশি বলে জানিয়ে ছোট একটি প্যাকেট বহনের অনুরোধ জানানো হয়। দেশে থাকা সহযোগীরা আসল ওষুধ সরিয়ে সেই মোড়কের ভেতর কৌশলে ইয়াবা ভরে দেন, যাতে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় না থাকে। চালান নিরাপদে পৌঁছে দিলে বাহককে দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। তবে অনেক সময় প্রকৃত বাহক জানতেই পারেন না তিনি কী বহন করছেন, ফলে সেই অর্থের ভাগও পান না।
একটি ঘটনায় দেখা যায়, সৌদিগামী একজন যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ওষুধ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরে দুটি ভিন্ন ওষুধের নামে ১৬০টি ইয়াবা লুকিয়ে প্যাকেট তৈরি করা হয়, যা ওই যাত্রীর কাছে পৌঁছে দিতে যাওয়ার পথে পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযানের সময় আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ঘটনার পর থানায় মামলা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
এর আগেও একই কায়দায় আরেক সৌদিপ্রবাসীর কাছে ৩৬০টি ইয়াবা পাঠানোর চেষ্টা ধরা পড়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সতর্কতায়। প্যাকেটের অস্বাভাবিক ওজন দেখে সন্দেহ হওয়ায় স্থানীয় লোকজন ডেকে সবার সামনে ভিডিও ধারণ করে সেটি খোলা হয়, আর তখনই বেরিয়ে আসে ওষুধের মোড়কের আড়ালে লুকানো মাদকের আসল চিত্র। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে চালানটি জব্দ করে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে এই ঘটনায় জড়িত এক নারী পরে আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
যিনি এই মাদক বহনের লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছিলেন, তিনি পরে জানান, চালানটি ধরা না পড়লে বিমানবন্দরে গিয়ে বিপদে পড়তে পারতেন তিনি নিজে ও তাঁর পরিবার। বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তদন্তে জানা গেছে, চক্রের সদস্যদের দায়িত্ব বিভক্ত। কেউ সৌদিগামী যাত্রী খুঁজে বের করেন, কেউ দেশে থেকে প্যাকেট তৈরি ও হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন, আবার কেউ সৌদি আরবে গিয়ে চালান গ্রহণ ও বিক্রির কাজ করেন। এক সৌদিপ্রবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকেও একইভাবে ওষুধ বহনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তবে তাড়াহুড়ার কারণে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে জানতে পারেন, এলাকার অনেক প্রবাসীকেই একইভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।
হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ডে চক্রের এক সদস্যের স্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, স্বামীকে এই কাজ থেকে বিরত থাকতে বারবার অনুরোধ করেছিলেন তিনি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তাঁর ভাষ্যে, চালান বহনকারী বেশির ভাগ মানুষই জানেন না তাঁরা আসলে কী বহন করছেন, আর ধরা পড়লে ঋণ করে বিদেশ যাওয়া একজন মানুষের গোটা জীবন ও পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় একাধিক প্রবাসীর অভিযোগ, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সৌদিগামী যাত্রীদের ব্যবহার করে মাদক পাচারের পাশাপাশি ফেরার পথে অবৈধভাবে স্বর্ণ আনার কাজেও জড়িত। আরেকটি অডিওতে চক্রের এক সদস্যকে নিজের দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসার কথা স্বীকার করতে শোনা গেলেও সাম্প্রতিক চালানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। একই অডিওতে অন্য একজনকে একজন প্রবাসীকে হুমকি দিতেও শোনা যায়।
স্থানীয় থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সঙ্গে অন্য দুই অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং চক্রের বাকি সদস্যদের শনাক্ত করতে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা। তিনি জানান, সম্প্রতি এক যাত্রীর কাছ থেকে চার হাজারের বেশি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে, আর সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। তবে এই বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।

