মোবাইল টাওয়ার থেকে ব্যাটারি, পাওয়ার ক্যাবল এবং নেটওয়ার্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি এখন দেশের টেলিকম খাতের জন্য এক ক্রমবর্ধমান মাথাব্যথায় পরিণত হয়েছে। এই চুরির কারণে একদিকে মোবাইল সেবা বারবার ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অপারেটরদের গুনতে হচ্ছে অপ্রত্যাশিত খরচ—আর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত প্রায় ২০ মাসে দেশের মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে চুরি হয়ে গেছে প্রায় ১৬ হাজার মিটার পাওয়ার ক্যাবল, দুই হাজারের বেশি ব্যাটারি এবং পাঁচশর বেশি রিমোট রেডিও ইউনিট। এর বাইরেও নিয়মিত চুরি হচ্ছে নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ বিটিএস কার্ডসহ আরও নানা সরঞ্জাম।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে দেশের মোবাইল অপারেটরদের একটি সংগঠন সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত আট মাসে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা—বিশেষ করে বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, লালবাগ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার ও গাজীপুরে চুরির ঘটনা রীতিমতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুরির প্রভাব শুধু চুরি হওয়া যন্ত্রপাতির দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষায়িত এসব সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে অপারেটরদের বাড়তি খরচের চাপে পড়তে হচ্ছে, একই সঙ্গে নেটওয়ার্ক বিভ্রাটের কারণে তাদের রাজস্ব আয়ও কমছে। একজন খাত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, চুরি ঠেকাতে অনেক জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হলেও এখন চোরেরা সেই ক্যামেরাগুলোও নিয়ে যাচ্ছে।
সংগঠনটির মহাসচিব বলেন, গত কয়েক বছরে মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো থেকে যন্ত্রপাতি চুরির প্রবণতা বহুগুণে বেড়েছে, যা গ্রাহক ও অপারেটর—দুই পক্ষের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চুরির তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নেটওয়ার্ক সংযোগে। ব্যাকআপ ব্যাটারি চুরি হয়ে গেলে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো টাওয়ারই বন্ধ হয়ে যায়। আর সক্রিয় সরঞ্জাম—যেমন রিমোট রেডিও ইউনিট বা বিটিএস কার্ড—খুলে নিলে সেই এলাকায় কল করা, ইন্টারনেট ব্যবহার সবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে হাজার হাজার গ্রাহক জরুরি প্রয়োজনে সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
সংগঠনটির মহাসচিব আরও জানান, চুরি যাওয়া অনেক সরঞ্জাম স্থানীয় বাজারে সহজে পাওয়া যায় না, ফলে সেগুলো প্রতিস্থাপন করতে এবং নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক করতে যথেষ্ট সময় লেগে যায়।
দেশের বড় অপারেটরদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই একটি শীর্ষ অপারেটরের বিটিএস কার্ড চুরির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। একই ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে অন্য দুই বড় অপারেটরের ক্ষেত্রেও। পাওয়ার ক্যাবল চুরির চিত্রও উদ্বেগজনক—সবচেয়ে বেশি ক্যাবল চুরির শিকার হয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি অপারেটর, যাদের হাজার হাজার মিটার ক্যাবল খোয়া গেছে।
সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চারটি অপারেটর মিলিয়ে মোট প্রায় আট হাজার মিটার পাওয়ার ক্যাবল, প্রায় দুইশর কাছাকাছি রিমোট রেডিও ইউনিট, একশ সাতাত্তরটির মতো বিটিএস কার্ড এবং সাতশর বেশি ব্যাটারি চুরি হয়েছে।
একটি বড় অপারেটরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগে চুরির ঘটনা মূলত ঢাকার বাইরে বেশি ঘটত, কিন্তু গত ২০ মাসে এই প্রবণতা ক্রমশ রাজধানীর দিকেও বিস্তৃত হয়েছে। অন্য একটি অপারেটরের একজন কর্মকর্তা জানান, দেশজুড়েই ব্যাটারি, রেডিও ও ট্রান্সমিশন সরঞ্জাম চুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে একদিকে বড় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহকদের সংযোগ ও সেবার অভিজ্ঞতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানার অপারেটরটির নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও চুরির শিকার হওয়া মোট ক্যাবল ও ব্যাটারির সিংহভাগই তাদের। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অপারেটরের সাইটগুলোতে ভৌত নিরাপত্তা ও তদারকির ঘাটতিই এর প্রধান কারণ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
আরেকটি অপারেটরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগে চোরেরা মূলত পাওয়ার ক্যাবল বা ব্যাকআপ ব্যাটারিকেই লক্ষ্য করত, কিন্তু এখন তারা অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা এখন রিমোট রেডিও ইউনিট, বিভিন্ন মডিউল ও বিটিএস কার্ডের মতো সক্রিয় সরঞ্জামও খুলে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, টেলিকম নেটওয়ার্কের বাইরে এসব যন্ত্রাংশের সাধারণত কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই, কিন্তু চুরি হলে সেবায় বিশাল বিঘ্ন ঘটে। মাত্র একটি চুরির ঘটনায় পুরো একটি এলাকার জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আর নতুন সরঞ্জাম এনে বসাতে বসাতে সাইটটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল থেকে যায়।
অপারেটরদের ভাষ্য, তারা নিয়মিতভাবে চুরির ঘটনা পুলিশকে জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ সরবরাহ করে এবং তদন্তে সহায়তাও করে। তবে তাদের দাবি, শুধু চোর ধরাই যথেষ্ট নয়—চুরির যন্ত্রাংশ যারা কিনে নেয়, তাদের চিহ্নিত করে পুরো চোরাই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। যদিও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে, তবু এখন পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছে অপারেটরদের সংগঠনটি।
এই সমস্যার সমাধানে টেলিকম অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি, আর এই আহ্বানের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছেও।

