টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় প্রায় দশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাত স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাতের আঁধারে, এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর একজন সাব-ঠিকাদারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জানা যায়, বাসাইল জিসি থেকে কাউলজানী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় হয়ে মাইজখাড়া পর্যন্ত সড়কে প্রায় নব্বই মিটার দৈর্ঘ্যের একটি পিএসসি গার্ডার সেতু নির্মাণের কাজ চলছিল। দশ কোটি নয় লাখ বিরানব্বই হাজার টাকা ব্যয় ধরে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শুরু হয়েছিল, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুর প্রায় আশি শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি রয়ে গেছে বিশ শতাংশ কাজ।
গত রোববার রাত সাড়ে দশটার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে, যেখানে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করা হচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে বিষয়টি লক্ষ করে বাধা দেন, ফলে সেই মুহূর্তে কাজ বন্ধও হয়ে যায়। এ সময় তারা মোবাইলে পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। তবে স্থানীয়রা স্থান ত্যাগ করার পরই রাতের মধ্যেই আবার কাজ শুরু করে তা সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যান।
এই ঘটনায় বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন, যেখানে দুজনকে আসামি করা হয়েছে—মূল ঠিকাদার ও একজন সাব-ঠিকাদার। মঙ্গলবার দুপুরে সেতুর কাছ থেকেই সাব-ঠিকাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার একটি এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে থানা হেফাজতে রয়েছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রধান আসামি ঠিকাদারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং শিগগিরই তাকেও আটক করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, বাসাইল পৌরসভার একজন সহকারী প্রকৌশলী এবং উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন উপসহকারী প্রকৌশলী। কমিটিকে একদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী মূল কাজের আগে প্রাক-কাজ ও নিচের ঢালাই সম্পন্ন করে পরবর্তীতে ফুটপাত ও ওয়াকওয়ের কাজ করার কথা। কিন্তু প্রকৌশল দপ্তরের অনুপস্থিতিতে গোপনে রাতের আঁধারে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও দায়িত্বহীন আচরণ বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করে না, বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের জানমালের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে থানায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকা অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন প্রকৌশল কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে সেতুটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং নির্মাণ উপকরণের মান যাচাইয়ে ল্যাব পরীক্ষাসহ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। শিগগিরই একটি চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হবে, এবং তার ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্মাণকাজে অনিয়মের এমন ঘটনা জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

