দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ফের চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। প্রথম দফার চার দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেনের আদালতে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আরও সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত চার দিন মঞ্জুর করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বিকেল ৪টা ৪ মিনিটে ডিবির একটি সাদা গাড়িতে করে গাজী নজরুলকে আদালতে আনা হয় এবং হাজতখানায় রাখা হয়। শুনানিকালে তিনি আসামির কাঠগড়ায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আসামি পক্ষ থেকে রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন জানানো হয়, তবে রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে আদালত আদেশ দেন।
ডিবির পক্ষ থেকে রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে মরিয়ম ‘খুবই আবেগি’ ছিলেন এবং অভিমান করে আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক বিভিন্ন ঝামেলার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে বলেও তদন্তকালে জানা যায়। মামলাটিকে ‘চাঞ্চল্যকর’ অভিহিত করে আবেদনে বলা হয়, মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় গাজী নজরুলের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। রিমান্ড শেষে মাকসুদাকে ২২ সেপ্টেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ভবনের পাঁচ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুলের। তিনি সেখানে প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে থাকতেন। লাশ উদ্ধারের পর রাতেই গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল, মাকসুদা ইসলাম এবং নিহত মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত জুন মাসে ওবায়দুর রহমানের সরাসরি প্ররোচনায় মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে স্বামী ও প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করছিলেন মরিয়ম। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও মাকসুদা বিভিন্ন বিষয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। মরিয়মের বিছানা থেকে একটি হাতে লেখা চিরকুটও পাওয়া যায়, যেখানে বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক যন্ত্রণা ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ ছিল। মামলার তৃতীয় আসামি ওবায়দুর রহমানকে ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-২ এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তিনি বাসাতেই ছিলেন এবং এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে খাচ্ছিলেন। খাওয়া শেষে মরিয়ম খেয়েছে কি না খোঁজ নিতে গিয়ে তার থাকার কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ পান। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। তবে মামলার বাদী পক্ষের অভিযোগ, মরিয়ম দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে পরিবারকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ঘটনার আগে গত জুলাই মাসে গাজী নজরুল ও মরিয়মের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এরপর তিনি দুই স্ত্রীকে নিয়ে ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। মামলাটি এখন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগ তদন্ত করছে। তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ জানিয়েছেন, গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তারা কিছু তথ্য দিয়েছেন, যা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
চার দিনের এই রিমান্ড শেষে তদন্ত কর্মকর্তা যদি মনে করেন আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন, তাহলে আদালতের কাছে ফের রিমান্ডের আবেদন করা হতে পারে। অন্যথায় তাকে কারাগারে পাঠানো হবে। মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা এবং সুইসাইড নোটের বিষয়বস্তু, এই তিনটি দিকই তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে। আইন অনুযায়ী, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ডিবি কত দ্রুত এই মামলার রহস্য উদঘাটন করতে পারে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় কি না।

