মানবপাচারের ভয়াবহ এক চক্রের শিকার হয়ে একটি পরিবার কীভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে, তার একটি বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে। এলাকার এক বাসিন্দা ২০২২ সালে দালালের মাধ্যমে নিজের ছোট ভাইকে ইতালি পাঠানোর জন্য এনজিও ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন।
লিবিয়ায় বসবাসরত একজন দালাল একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তার সঙ্গে চুক্তি হয়—দশ লাখ টাকা দাবি করা হলেও শেষ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হয়। মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে বিমানে ওঠেন ভাইটি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য ওই দালাল তাকে লিবিয়ার বেনগাজি হয়ে ত্রিপোলিতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়।
সেখানে একটি জানালাহীন কক্ষে আটকে রেখে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়, এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে বিশ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে চক্রটি। বড় ভাই সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানান, পাচারকারীদের উপস্থিতিতেই কেবল তার ভাইকে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো, এবং সে জানিয়েছিল—চাহিদামতো টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ভাইকে মুক্ত করতে পৈতৃক জমি বিক্রি করে এবং আরও ঋণ নিয়ে দশ লাখ টাকা জোগাড় করে দেন বড় ভাই। কিন্তু তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলে পাচারকারীরা এবার তার বাবাকেই অপহরণ করে, যিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে লিবিয়ায় কাজ করছিলেন। আরও দশ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর গত বছরের ৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন, এবং সেই অর্থ জোগাড় করতেও পরিবারকে আরও জমি বিক্রি করতে হয়।
আদালতে রেকর্ড করা জবানবন্দিতে বাবা বর্ণনা করেন, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে অপহরণ করে এত মারধর করা হয় যে তার উপরের পাটির দুটি দাঁত ভেঙে যায়। তিনি বলেন, দালাল তাকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিয়েছে এবং তিনি চান তার উপযুক্ত শাস্তি হোক।
শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের শেষ দিকে আরেকটি চক্রের সহায়তায় আরও পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ছোট ভাই ইতালিতে পৌঁছান। তবে পরিবারটি এখনো গভীর ঋণের বোঝায় জর্জরিত—প্রতি মাসে মহাজনদের এক থেকে দেড় লাখ টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তাদের।
গত বছরের জুলাইয়ে চুয়াডাঙ্গার একটি আদালতে দালাল, তার স্ত্রী ও আরও দুজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন বড় ভাই, যাদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় থানা তদন্ত করলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় অপরাধ তদন্ত বিভাগের জেলা ইউনিটকে। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্তে চারজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, এবং সংগৃহীত মোট প্রায় সাড়ে পঁচিশ লাখ টাকার একটি অংশ অন্য দুই আসামির ব্যাংক হিসাবেও জমা হয়েছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। এই মামলার অভিযোগপত্র ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় পাঠানো হয়েছে।
দেশে ফেরার কিছুদিন পরই মূল দালালকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার স্ত্রী আদালতে আত্মসমর্পণ করেন—দুজনই বর্তমানে জামিনে আছেন, বাকি দুই আসামি এখনো পলাতক।
এই পরিবারের দুর্ভোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও আলমডাঙ্গারই আরেক বাসিন্দার লিবিয়ায় একটি আটককেন্দ্রে নির্যাতনে মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল, যেখানে তাকে ইউরোপে পাঠাতে পরিবার প্রায় বিয়াল্লিশ লাখ টাকা খরচ করেছিল বলে অভিযোগ। লিবিয়ায় পৌঁছেও বিপদ শেষ হয় না—বছরের পর বছর ধরে ইউরোপে যাওয়ার বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনা এখনো থামেনি।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা এখনো অন্যতম বৃহৎ একটি গোষ্ঠী। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় এক লাখ দশ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, যার মধ্যে শুধু গত বছরেই প্রবেশ করেছেন বিশ হাজারের বেশি মানুষ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই লিবিয়া থেকে প্রায় চার হাজার আড়াইশর বেশি বাংলাদেশি ইতালিতে এবং সাড়ে তিন হাজারের বেশি গ্রিসে পৌঁছেছেন।
একই সময়ে গত ছয় বছরে প্রায় পনেরো হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে দেশে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছে ওই সংস্থাটি। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা অভিবাসীদের পঁচাত্তর শতাংশই লিবিয়ায় প্রতিশ্রুত কাজ পাননি, তিরানব্বই শতাংশকে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল, ঊনআশি শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ঊনসত্তর শতাংশের কোনো চলাফেরার স্বাধীনতাই ছিল না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের মে পর্যন্ত সারাদেশে পাঁচ হাজার দুইশর বেশি মানবপাচার মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় ঝুলে আছে, যার একটি বড় অংশ এখনো তদন্তাধীন এবং বাকি অংশ বিচারাধীন। চলতি বছরেও প্রতি মাসেই নতুন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে এই তালিকায়, অথচ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি মামলা।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত মানবপাচার সংক্রান্ত কোনো মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই—বরং অধিকাংশ মামলাতেই আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন, যা এই ধরনের অপরাধ দমনে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরিতে ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

