পটুয়াখালী জেলা রাজস্ব প্রশাসনের ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পরীক্ষায় নিজের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে লিখিত পরীক্ষা দেওয়ানোর অভিযোগে জহিরুল ইসলাম (২৩) নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা দিতে এসে তিনি ধরা পড়েন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভাইভা বোর্ডে উপস্থিত হলে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয় এবং পরে হাতের লেখা যাচাই করে জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হন তাঁরা। আটক জহিরুল ইসলাম পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা ইউনিয়নের বটকাজল এলাকার আমির হোসেন হাওলাদারের ছেলে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর)। সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পটুয়াখালী সরকারি কলেজের বাণিজ্য ভবনে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ পরীক্ষার্থী অংশ নেন। মোট ১০টি শূন্য পদের বিপরীতে এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মাত্র ৫৯ জন। তাদের শনিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। ভাইভা বোর্ডে জহিরুল ইসলাম উপস্থিত হলে কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেন, তার হাতের লেখার সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার খাতায় থাকা হাতের লেখার সুস্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। পাশাপাশি বোর্ডের বিভিন্ন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় তার বিষয়ে আরও সন্দেহ হয়। পরে লিখিত পরীক্ষার খাতার হাতের লেখা বিস্তারিত যাচাই করে অসঙ্গতির বিষয়টি নিশ্চিত হন কর্মকর্তারা। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে লিখিত পরীক্ষায় তার পরিবর্তে অন্য একজন অংশ নিয়েছিলেন।
পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নিয়োগ পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে জহিরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে। তিনি জানান, লিখিত পরীক্ষায় জহিরুলের হয়ে অন্য একজন পরীক্ষা দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং পরে জহিরুল নিজে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে এলে সন্দেহ হওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়টি প্রকাশ পেলে তাকে আটক করা হয়। ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় জহিরুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,
এই ঘটনা বাংলাদেশে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতির একটি চলমান ধারারই নতুন সংযোজন। ইতিমধ্যে এই পটুয়াখালীতেই সম্প্রতি আরেকটি জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে কুয়াকাটায় নিজেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে প্রতারণা, জাল নিয়োগপত্র তৈরি এবং ৪৪তম বিসিএসের গেজেটের তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিবর্তনের অভিযোগে একজনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পটুয়াখালী থেকেই কমপক্ষে ৪৫ জনকে আটক করা হয়েছিল। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
এই ধরনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পটুয়াখালীর শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ। স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, প্রক্সি দিয়ে লিখিত পরীক্ষা দেওয়া এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি রয়েছে। একজন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আমাদের সন্তানরা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পরীক্ষা দেয়, আর কেউ একজন অন্যকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর পরেও ভাইভা পর্যন্ত ডাক পায়, এটা চরম অন্যায়।’ তারা দাবি জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনায় কঠোর শাস্তির পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
এই ঘটনা সরকারি চাকরির পরীক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আঙুলের ছাপ ও বায়োমেট্রিক যাচাই বা ছবি মিলিয়ে দেখা হলে প্রক্সি ঠেকানো সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতে নিয়োগ পরীক্ষায় যোগদানের আগে ডিজিটাল আঙুলের ছাপ ও ছবি যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, এই মামলার তদন্তে প্রক্সি দিয়ে লিখিত পরীক্ষা দেওয়া ব্যক্তি কে, তা বেরিয়ে আসে কি না এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা কতটা দ্রুত সংশোধন করা হয়।

