সাভারের আশুলিয়ায় একটি পুরোনো সম্পত্তির বিরোধ চরম আকার ধারণ করে বিশাল এক আর্থিক ও আইনি সংকটের জন্ম দিয়েছে। রবিবার বিকেলে শ্রীপুর এলাকার তাহফিজুল কোরআনিল কারিম ফাজিল মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মাদ্রাসার উপপরিচালক প্রশাসন সৈয়দ সানজিদ বাদী হয়ে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাসহ মোট ৭৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এর অধীনস্থ বাণিজ্যিক সম্পত্তি দখলের এই চেষ্টা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে সোমবার ভোরে আশুলিয়া থানায় এই মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়।
সাধারণ দৃষ্টিতে এটিকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে বিশাল এক আর্থিক ও সম্পত্তির হিসাব নিকাশ। মামলার এজাহার থেকে জানা যায় মূল বিরোধটি মূলত মাদ্রাসার মালিকানাধীন একটি বাণিজ্যিক মার্কেটকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই মার্কেটটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য একটি প্রভাবশালী মহল চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে প্রধান আসামি ইমাম হাসানের নেতৃত্বে বিশাল এক সশস্ত্র দল জোরপূর্বক ওই মার্কেট এবং মাদ্রাসার ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল দেশীয় অস্ত্র ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে পুরো বাণিজ্যিক এলাকাটির দখল নিজেদের হাতে নেওয়া এবং মাদ্রাসার বর্তমান প্রশাসনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখান থেকে বিতাড়িত করা।
দখলদারিত্বের এই চেষ্টায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়েছে তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। হামলাকারীরা ভেতরে প্রবেশ করেই ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করে। তারা মাদ্রাসার আসবাবপত্র দরজা জানালা থেকে শুরু করে নিরাপত্তার জন্য বসানো প্রায় বিশটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র এই অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণই প্রায় পনেরো লাখ টাকার সমান। তবে অপরাধীরা কেবল ভাঙচুর করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা মাদ্রাসার লকার ভেঙে নগদ বিশ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এর পাশাপাশি প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা মূল্যের দুটি ল্যাপটপ এবং দুই লাখ টাকা দামের দশটি উন্নতমানের কম্পিউটার মনিটরও লুট করা হয়। সব মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির প্রায় চল্লিশ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধন করে এই সংঘবদ্ধ দলটি।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হলো স্থানীয় রাজনীতির সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং দুই পক্ষের বিপরীতমুখী দাবি। মামলার দুই নম্বর আসামি হিসেবে নাম এসেছে সাভারের ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেনের। তবে এই রাজনৈতিক নেতা গণমাধ্যমের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি মামলার বাদী সৈয়দ সানজিদ নিজেই একজন মাদকাসক্ত এবং তিনি জোরপূর্বক মাদ্রাসাটি দখল করে রেখেছিলেন। জাকির হোসেন নিজেকে ওই মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবেও দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে বর্তমান প্রশাসনকে বিতাড়িত করেছে। যদিও আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুল গফুর এই মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে নিশ্চিত করেছেন।
পাল্টাপাল্টি এই অভিযোগের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৬০ থেকে ৭০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে এজাহার গঠন করা হয়েছে। মাদ্রাসার সিকিউরিটি ইনচার্জ পঁয়ষট্টি বছর বয়সী আলতাব হোসেন বাধা দিতে গেলে তাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে পুলিশকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে আসামিদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা এখন প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

