সকাল গড়িয়ে গেলেও চিকিৎসকের দেখা মেলেনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। শিশুসহ শত শত রোগী ও স্বজন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে অনেকেই বিনা চিকিৎসায় ফিরে গেছেন। আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালের এই চিত্র মুঠোফোনে ধারণ করে ফেসবুকে দিলে ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার কারণ নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জেলার সিভিল সার্জন বলেছেন, তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন।
প্রতিবেদকের সরেজমিন তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৮টা থেকে প্রায় ১০টা পর্যন্ত হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের কক্ষগুলো ফাঁকা ছিল। সাধারণত এই সময়েই বহির্বিভাগে রোগীর ভিড় থাকে। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকেরা কর্মস্থলে না আসায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও চিকিৎসক না পেয়ে রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। অনেকে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে আছেন উপজেলার বগাপুতা গ্রামের জাহানারা বেগম। তিন মাস বয়সী শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুকে নিয়ে তিনি হাসপাতালের ১৪ নম্বর কনসালটেন্ট কক্ষের সামনে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তিনি জানান, দুই শ টাকা খরচ করে এসেছেন, অথচ এসে দেখেন চিকিৎসক নেই। এমন পরিস্থিতিকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই অবস্থা রুবি আক্তারের। চার মাসের অসুস্থ শিশুকে নিয়ে সকাল আটটা থেকে বসে থেকেও চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে তিনি ক্ষোভ জানাতে জানাতে বিনা চিকিৎসায় হাসপাতাল ছাড়েন।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির সুযোগে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দালালেরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা দূর থেকে আসা অসহায় ও জরুরি রোগীদের নানাভাবে বুঝিয়ে বাইরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
চিকিৎসকদের এই অনুপস্থিতি নিয়ে জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকিরের সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ফখরুল হাসান চৌধুরী বলেন, তিনি গতকাল সোমবারই ওই হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, সেখানে এমনটা হওয়ার কথা নয়। আজ সকালে ঠিক কী কারণে চিকিৎসকেরা সময়মতো আসেননি, তা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা, তা প্রতিবেদনের দুটি উদাহরণেই স্পষ্ট। দুজনই মা, দুজনেরই কোলে তিন-চার মাসের অসুস্থ শিশু। এক শিশুর শ্বাসকষ্ট ছিল। এত ছোট শিশুর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট দ্রুত জটিল হতে পারে, তাই দেড় ঘণ্টা বা তারও বেশি অপেক্ষা শুধু অসুবিধা নয়, ঝুঁকিও। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মূলত গ্রামের মানুষের প্রথম ভরসা। এখানে চিকিৎসক না মিললে তাঁদের হাতে বিকল্প খুব সীমিত থাকে। ফলে যাঁরা বেসরকারি চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন না, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
জাহানারা বেগমের কথায় খরচের দিকটিও উঠে এসেছে। দুই শ টাকা খরচ করে আসা মানে যাতায়াতেই একটি পরিবারের বাড়তি ব্যয়। ফিরে যাওয়ার পর সেই টাকাও গেল, চিকিৎসাও হলো না। চিকিৎসা না পেয়ে অনেকে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হলে খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। এখানেই দালালদের সক্রিয়তার তাৎপর্য। সরকারি সেবা ব্যর্থ হলে সেই শূন্যতা পূরণ করে ব্যয়বহুল বেসরকারি ব্যবস্থা। প্রতিবেদনে দালালদের আচরণ সরেজমিনে দেখার কথা বলা হয়েছে, তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম আসেনি। তাই এটি একটি পর্যবেক্ষণ হিসেবেই দেখা উচিত, নির্দিষ্ট অভিযোগ হিসেবে নয়।
সিভিল সার্জনের বক্তব্যে একটি লক্ষণীয় বিষয় আছে। তিনি আগের দিনই হাসপাতাল পরিদর্শন করেছিলেন এবং বলছেন, এমন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু একদিনের পরিদর্শন প্রতিদিনের উপস্থিতির নিশ্চয়তা দেয় না। সাধারণত পরিদর্শনের দিন উপস্থিতি ঠিক থাকে, অন্য দিন তা শিথিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আসল প্রশ্ন, প্রতিদিনের হাজিরা তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না। যেমন, সকালের উপস্থিতির হিসাব কে রাখেন এবং অনুপস্থিত থাকলে তার জবাব কে চান। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
এই ঘটনার কারণও এখনো অজানা। চিকিৎসকেরা কেন একসঙ্গে সময়মতো আসেননি, তা জানা যায়নি। হতে পারে কোনো সভা, প্রশিক্ষণ বা প্রশাসনিক কাজের জন্য তাঁরা অন্যত্র ছিলেন। আবার এমনও হতে পারে, এটি নিয়মিত শৈথিল্যের ফল। প্রতিবেদনে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য না থাকায় কোনো ব্যাখ্যাই যাচাই করা যাচ্ছে না। তাঁকে ফোনে না পাওয়া নিজেই একটি প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে দ্রুত ব্যাখ্যা আশা করা হয়। তবে ফোন না ধরার কারণও জানা নেই, তাই এ থেকে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
আরেকটি দিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। রোগীদের তোলা ভিডিও ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি জেলা পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এখন সিভিল সার্জন বলছেন, তিনি খতিয়ে দেখছেন। অর্থাৎ ভিডিও না ছড়ালে ঘটনাটি হয়তো আড়ালেই থেকে যেত। এটি একদিকে নাগরিকদের হাতে জবাবদিহি চাওয়ার নতুন সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থা কেন আগে থেকে এই সমস্যা ধরতে পারল না।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি হাসপাতালের একদিনের অব্যবস্থার চেয়ে বড় প্রশ্ন সামনে আনে। উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা শক্ত। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে এখন তিনটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, সিভিল সার্জনের তদন্তে অনুপস্থিতির কারণ কী পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না। তৃতীয়ত, হাজিরা তদারকি ও দালাল ঠেকানোর জন্য কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ আসে কি না। এসব উত্তর না এলে এমন ঘটনা আবার ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

