রাজধানী ঢাকায় কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে সমন্বিত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, নগরীতে এখন ১২২টি অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসার পরই কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার ও পুলিশ নেতৃত্ব।
সাম্প্রতিক কয়েকটি গ্যাংভিত্তিক হত্যাকাণ্ড রাজধানীবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল। ওইদিন মোহাম্মদপুরভিত্তিক ‘অ্যালেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা ছিল। এই হত্যা মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে ‘পিচ্চি হেলাল’কে আসামি করা হয়েছে।
এর কয়েক মাস পরে, ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আর্শিনগরে একটি সেলুনের ভেতরে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ‘পাতালি গ্রুপ’-এর নেতা ফরহাদকে। অভিযোগ আছে, তিনি পিচ্চি হেলালের নির্দেশে কাজ করতেন। পরপর ঘটা এই দুটি হত্যাকাণ্ড ইঙ্গিত দেয়, গ্যাংগুলোর মধ্যকার আধিপত্যের লড়াই এখন আরও প্রকাশ্য ও প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে।
ডিএমপির প্রতিবেদনে সবচেয়ে স্পর্শকাতর যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো এসব গ্যাংয়ের রাজনৈতিক সংযোগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চক্রগুলোর বেশিরভাগই আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন তাদের পৃষ্ঠপোষকতা চলে গেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হাতে। অর্থাৎ ক্ষমতার পালাবদল হলেও অপরাধী চক্রের ওপর রাজনৈতিক ছায়া সরেনি, শুধু ছাতার মালিক বদলেছে। এটি পুলিশের জন্য বড় পরীক্ষা। কারণ, প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের গায়ে হাত দিতে না পারলে মাঠপর্যায়ের অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ফল দেবে না।
বিভাগওয়ারি চিত্রে দেখা যায়, গ্যাংয়ের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগ। সেখানে সক্রিয় চক্র ৩২টি। এরপর আছে তেজগাঁও বিভাগ, যেখানে চক্রের সংখ্যা ৩০। অন্য বিভাগগুলোতে সংখ্যা তুলনামূলক কম। ওয়ারীতে ১৩টি, গুলশানে ১১টি, লালবাগ, উত্তরা ও মতিঝিলে প্রতিটিতে ১০টি এবং রমনায় ৬টি গ্যাং সক্রিয় আছে।
তবে সংখ্যা আর সহিংসতা এক জিনিস নয়। গ্যাংয়ের সংখ্যায় মিরপুর শীর্ষে থাকলেও প্রাণহানির হিসাবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত শুধু মোহাম্মদপুরেই গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই রক্তপাত ঠেকাতে পুলিশ পাল্টা অভিযান জোরদার করেছে। তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান জানিয়েছেন, অপরাধপ্রবণ এলাকায় আগে সপ্তাহে একবার বা দুবার ব্লক রেইড হতো। এখন প্রায় একদিন পরপরই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
মিরপুরের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। এই বিভাগের ৩২টি গ্যাংয়ের মধ্যে ১৪টিই পল্লবী থানা এলাকায় সক্রিয়। দারুস সালাম এলাকায় আছে আরও ৬টি। পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মিরপুরে এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে দুটি নতুন চক্র, ‘মামুন বাহিনী’ ও ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’।
তারা পল্লবী, রূপনগর ও ভাসানটেক এলাকায় জমি ও ব্যবসা দখল করছে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ফুটপাত, বাজার, বস্তি, পোশাক কারখানা ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এসব খাত সাধারণ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফলে চাঁদাবাজির চাপ পড়ছে পণ্যের দামে ও মানুষের নিরাপত্তায়। মিরপুরের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে। গ্যাং ও চাঁদাবাজি দমনে পুলিশ সদস্যদের কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও কঠোর বার্তা এসেছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সহায়তায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একই অবস্থান তুলে ধরেছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাদের সমূলে উৎপাটন করা হবে। দেশের কোথাও সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজ আশ্রয় পাবে না। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, যে অপরাধ করবে কিংবা অপরাধীদের প্রশ্রয় দেবে, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব নির্দেশনার ওপর বিশেষ জোর দেন। বৈঠকে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে পুলিশের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। তবে তিনি স্বীকার করেন, শুধু পুলিশের পক্ষে এই সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য। ঢাকাকে নিরাপদ ও সন্ত্রাসমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
একই বৈঠকে অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সাইদুর রহমান কর্মকর্তাদের আলাদা নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংগুলোর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। শনাক্ত হওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকার ও পুলিশ নেতৃত্বের বক্তব্যে একটি মিল স্পষ্ট। সবাই বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু ডিএমপির নিজস্ব প্রতিবেদনেই বলা হচ্ছে, গ্যাংগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা এখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। ফলে ঘোষণার সততার প্রমাণ মিলবে মাঠের কাজে। শুধু গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করলে চলবে না। পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের নাম প্রকাশ, তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কিশোরদের গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক সমস্যাও। বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা ও মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের এই পথে ঠেলে দেয়। তাই অভিযানের পাশাপাশি স্কুল, পরিবার ও স্থানীয় সমাজকে যুক্ত করা দরকার। ডিএমপি কমিশনারের জনসহযোগিতার আহ্বান এই বাস্তবতাকেই ইঙ্গিত করে।
তৃতীয়ত, ঘন ঘন ব্লক রেইড তাৎক্ষণিকভাবে চাপ তৈরি করলেও স্থায়ী সমাধান দেয় না। জমি দখল, ঝুট ব্যবসা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো অর্থনৈতিক উৎস বন্ধ না হলে এক চক্র ভাঙলে অন্য চক্র জায়গা নেবে। মিরপুরে নতুন দুটি চক্রের উত্থান তারই ইঙ্গিত।
সব মিলিয়ে ঢাকার নিরাপত্তা এখন কঠোর অভিযান, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ ও সামাজিক উদ্যোগের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করছে। কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। না থাকলে এই ঘোষণাও আগের অনেক অভিযানের মতো সাময়িক আলোচনাতেই সীমিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

