মাগুরায় মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ৫০৬ কোটি টাকার বেশি বিল হাতে পেয়েছেন এক আবাসিক গ্রাহক। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাঠানো এই বিল দেখে হতবাক হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ভুলের কথা স্বীকার করে বলেছে, বিলটি দ্রুত সংশোধন করা হবে।
বিলটি ইস্যু করা হয়েছে মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামের বাসিন্দা মোছা. আলেয়া খাতুনের নামে। তিনি একই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী। সেপ্টেম্বর মাসের এই বিলে গ্রাহকের শ্রেণি হিসেবে উল্লেখ আছে ‘এলটি-এ (আবাসিক)’। অর্থাৎ এটি কোনো শিল্প বা বাণিজ্যিক সংযোগ নয়, একটি সাধারণ ঘরোয়া বিদ্যুৎ সংযোগ।
বিলের তথ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্ট মিটারের রিডিং ছিল ১৬০। ৮ সেপ্টেম্বর তা দাঁড়ায় ৩৯৫। এই হিসাবে এক মাসে বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে ২৩৫ ইউনিট। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যবহার হিসেবে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিলটি ইস্যু হয় ১০ সেপ্টেম্বর। পরিশোধের শেষ দিন ছিল মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর।
কিন্তু বিলের অঙ্ক দেখে বিস্ময়ের সীমা থাকেনি। ২৩৫ ইউনিটের স্বাভাবিক বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা। এর ওপর ভ্যাট বসেছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা। সঙ্গে মিটার ভাড়া ১০ টাকা। সব মিলিয়ে মোট বিল দাঁড়িয়েছে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে বিলম্ব মাশুলসহ এই অঙ্ক হতো ৫৩০ কোটি ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ টাকা।
অথচ ২৩৫ ইউনিট ব্যবহারের প্রকৃত বিল হওয়ার কথা ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। বিলম্ব মাশুলসহ তা দাঁড়ানোর কথা ২ হাজার ৫৬ টাকা। অর্থাৎ ভুল বিল আসল বিলের প্রায় আড়াই লাখ গুণেরও বেশি।
ক্ষুব্ধ গ্রাহক আলেয়া খাতুন বলেন, এটি শুধু ভুতুড়ে বিল নয়, আজগুবিও। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুৎ বিভাগের খামখেয়ালিপনায় গ্রাহকের দুশ্চিন্তা ও ভোগান্তি বাড়ছে। এ ধরনের ভুলের প্রতিকার হওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম। তিনি জানান, গ্রাহকের মিটার বদলানোর সময় ভুলবশত মিটারের সিল নম্বরের অঙ্কগুলো ডিমান্ড চার্জের ঘরে বসে গেছে। এতেই এই অস্বাভাবিক বিল তৈরি হয়েছে। তাঁর আশ্বাস, বিলটি দ্রুত সংশোধন করা হবে। তবে গ্রাহককে ২৩৫ ইউনিটের নির্ধারিত বিলই পরিশোধ করতে হবে বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
এই ঘটনা কেবল একটি কারিগরি ভুল হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। কারণ, এতে বিল তৈরির প্রক্রিয়ার কয়েকটি দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, ডেটা এন্ট্রির ভুল। কর্মকর্তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মিটার পরিবর্তনের সময় সিল নম্বর ভুল ঘরে বসেছে। এমন ভুল সাধারণত হাতে তথ্য বসানোর সময় ঘটে। প্রশ্ন হলো, ডেটা এন্ট্রির পর যাচাইয়ের কোনো ধাপ ছিল কি না। থাকলে তা কাজ করেনি।
দ্বিতীয়ত, স্বয়ংক্রিয় সতর্কতার অভাব। একটি আবাসিক সংযোগের বিল কয়েক হাজার টাকার জায়গায় শত শত কোটি টাকা হয়ে গেলে সফটওয়্যারেরই তা ধরার কথা। সাধারণ একটি সীমা নির্ধারণ থাকলেই এমন বিল ছাপার আগে আটকে যেত। সেটি না থাকায় বিল সরাসরি গ্রাহকের হাতে পৌঁছেছে।
তৃতীয়ত, গ্রাহকের ভোগান্তি ও মানসিক চাপ। বিলটি ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিশোধের সময় ছিল। সংশোধনের আশ্বাস মিললেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে গ্রাহকের ওপর বিলম্ব মাশুল বা সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঝুঁকি পড়ে কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি। সংশোধিত বিল কবে দেওয়া হবে এবং এ নিয়ে গ্রাহককে কোনো হয়রানির মুখে পড়তে হবে না, সেই নিশ্চয়তাও দেওয়া উচিত।
চতুর্থত, আস্থার প্রশ্ন। এমন ঘটনা বিদ্যুৎ সেবার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে করে দেয়। ‘ভুতুড়ে বিল’ শব্দটি দেশে নতুন নয়। বারবার এমন অভিযোগ উঠলে গ্রাহক নিজের বিল নিয়েও সন্দিহান হয়ে পড়েন। তাই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যবস্থাগত সংস্কার দরকার।
ভুল স্বীকার করে দ্রুত সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া ইতিবাচক। তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং মিটার পরিবর্তনের সময় তথ্য যাচাইয়ের নিয়ম কঠোর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক অঙ্কের বিল আটকে দেওয়ার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করাও জরুরি। তাহলেই একজন গ্রাহকের দুর্ভোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে অন্য গ্রাহকদের এমন বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

