মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে অগ্রণী ব্যাংকের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পলাতক ব্যাংক কর্মকর্তা শরিফুজ্জামান সোহাগকে ঢাকা থেকে আটক করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়া এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। সেখানে তিনি বোনের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন। আটকের মধ্য দিয়ে ঘটনার একটি ধাপ এগোলেও অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, অন্য কেউ জড়িত কি না এবং গ্রাহকেরা টাকা ফেরত পাবেন কি না, এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. কামরান হোসেন জানান, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও শ্রীনগর থানার সমন্বয়ে গঠিত একটি দল বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করে। এ সময় তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২০০ টাকা, তিনটি মোবাইল ফোন, একটি চেকবই, দুটি এটিএম কার্ড ও ব্যাংক লকারের একটি চাবি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থ গ্রাহকদের দাবির তুলনায় অতি সামান্য। ফলে বাকি অর্থ কোথায় গেছে, তা খুঁজে বের করা তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। লকারের চাবি ও চেকবই উদ্ধার তদন্তে নতুন সূত্র দিতে পারে, তবে এ নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
পুলিশ ও ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শ্রীনগর শাখার বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে সোহাগের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কয়েক দিন ধরে ব্যাংকের সামনে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভিড় ও বিক্ষোভ দেখা যায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে ২৫৫ জন গ্রাহক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। রোববার ১৮৪ জন, সোমবার ৪৬ জন এবং মঙ্গলবার ২৫ জন অভিযোগ করেন। অভিযোগে পাওনার পরিমাণ সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৮৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। গতকাল বুধবারও সকাল থেকে শত শত গ্রাহক ব্যাংকের সামনে অবস্থান নেন। দৈনিক অভিযোগের সংখ্যা কমে এলেও ভুক্তভোগীর সংখ্যা ও ক্ষতির অঙ্ক বাড়তে পারে, কারণ অনেক গ্রাহক এখনো হিসাব যাচাই করছেন বলে ধারণা করা যায়। তবে এটি অনুমান, এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিছু বলেনি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংকের নির্ধারিত জমা স্লিপ ব্যবহার করেই তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ সত্য হলে ঘটনাটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে আনে। একজন কর্মকর্তা এত দীর্ঘ সময় ধরে এবং এত গ্রাহকের টাকা কীভাবে আত্মসাৎ করতে পারলেন, শাখার তদারকি ও নিরীক্ষা কেন তা ধরতে পারেনি, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে এ বিষয়ে ব্যাংক বা পুলিশের কোনো ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই।
অগ্রণী ব্যাংকের মুন্সীগঞ্জ জেলার শাখাগুলোর দায়িত্বে থাকা প্রধান কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, তাঁরা একজনকে অভিযুক্ত করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের আরও কেউ জড়িত কি না এবং অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক ইসমাঈল হোসেন জানান, গত শুক্রবার ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি জিডি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে এবং তা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও পাঠানো হয়। এখানে লক্ষণীয়, ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত জিডি করা হয়েছে, মামলা নয়। জিডি মূলত তথ্য জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি, আর অপরাধের বিচার শুরু হয় মামলার মাধ্যমে।
সেই বাস্তবতা স্পষ্ট করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি, তাই সোহাগকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। সাধারণত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের এই ধারা প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু অভিযুক্তকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে হলে দ্রুত মামলা দায়ের জরুরি। কে মামলা করবেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, নাকি ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
সব মিলিয়ে সোহাগের আটক গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও তাঁদের আসল প্রত্যাশা হারানো অর্থ ফেরত পাওয়া। তা নির্ভর করবে মামলার অগ্রগতি, আত্মসাৎ করা অর্থের উদ্ধার এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দায় নেওয়ার সিদ্ধান্তের ওপর। একই সঙ্গে ব্যাংকের আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা উদঘাটন করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করাও জরুরি, যাতে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়।

