যৌন হয়রানির অভিযোগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) তিন শিক্ষককে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের ১২৩তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। আজ বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর সকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিন্ডিকেটের এক সদস্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
একই সঙ্গে সিদ্ধান্তটি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে, কারণ যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শাস্তি নেওয়ার ঘটনা তুলনামূলক বিরল। তবে এখন পর্যন্ত তথ্য এসেছে মূলত একজন অনামা সিন্ডিকেট সদস্যের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিন্ডিকেট সূত্রে জানা গেছে, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশীদুল ইসলামকে অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে নামানো হয়েছে। ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শামীম হোসেনকে সহকারী অধ্যাপক থেকে প্রভাষক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাকিবুল ইসলামকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনমন করা হয়েছে।
অর্থাৎ তিনজনের প্রত্যেকেই এক ধাপ করে নিচের পদে নেমেছেন। বিশেষ করে শামীম হোসেনের ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পদে নামা শিক্ষকতা জীবনে বড় ধাক্কা, কারণ এতে পদমর্যাদার পাশাপাশি বেতন-ভাতা ও ভবিষ্যৎ পদোন্নতির হিসাবেও প্রভাব পড়তে পারে। পদাবনতি কবে থেকে কার্যকর হবে এবং এর আর্থিক প্রভাব কী, সে তথ্য এখনো জানা যায়নি।
তিন শিক্ষকের মধ্যে কেবল রশীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেছে। জানা যায়, গত বছরের ১৯ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে অধ্যাপক রশীদুল ইসলাম ও এক ছাত্রীর মেসেঞ্জারে কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী ছাত্রী নিজের পরিচয় গোপন রেখে এসব স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন।
পরে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গ্রুপে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত একটি স্ট্যাটাসও দেন। এরপর ওই স্ট্যাটাস ও স্ক্রিনশট বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। এর মানে, অভিযোগটি প্রথমে আনুষ্ঠানিক পথে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা পান না বলে এমন পথ বেছে নেন, তবে এ ক্ষেত্রে ছাত্রীর কারণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে, গত বছরের ১৭ এপ্রিল অধ্যাপক রশীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পরীক্ষার খাতায় নম্বর টেম্পারিং ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ওই ছাত্রী। অর্থাৎ ফেসবুকে স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার মাত্র দুই দিন আগে তিনি প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। এই সময়ক্রম থেকে ধারণা করা যায়, লিখিত অভিযোগের পর প্রশাসনের দিক থেকে দ্রুত সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি অনুমান, প্রতিবেদনে এর সরাসরি সমর্থন নেই। লক্ষণীয়, লিখিত অভিযোগটি ছিল নম্বর টেম্পারিং ও হুমকির, যৌন হয়রানির নয়। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত যৌন হয়রানির অভিযোগে হলেও দুটি অভিযোগের সম্পর্ক এবং কোন অভিযোগের ভিত্তিতে কী তদন্ত হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই।
ঘটনাটির কয়েকটি দিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, সময়ের ব্যবধান। ১৯ এপ্রিলের ঘটনার প্রায় সতেরো মাস পর শাস্তির সিদ্ধান্ত এসেছে। এই সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল কি না, কমিটি কী পেয়েছে এবং সিন্ডিকেট কোন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জানা যায়নি। দীর্ঘ এই সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে, সেটিও প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, শাস্তির ধরন।
বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুতির বদলে পদাবনতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেউ ভারসাম্যপূর্ণ বলতে পারেন, আবার কেউ অভিযোগের গুরুত্বের তুলনায় লঘু মনে করতে পারেন। এ বিষয়ে সিন্ডিকেটের যুক্তি জানা না গেলে মূল্যায়ন করা কঠিন। তৃতীয়ত, বাকি দুই শিক্ষকের ক্ষেত্রে কী অভিযোগ ছিল, কবে ও কীভাবে তা প্রকাশ পেয়েছিল, প্রতিবেদনে সে তথ্য একেবারেই নেই। ফলে তিনজনের শাস্তি এক সূত্রে গাঁথা কি না এবং প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অভিযোগের ধরন একই ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
আইনি ও প্রশাসনিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষকেরা আপিল বা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন কি না এবং তাঁরা সেই পথে যাবেন কি না, তা এখনো অজানা। এ পর্যন্ত তিন শিক্ষকের কারও নিজস্ব বক্তব্য প্রতিবেদনে আসেনি, ফলে তাঁদের পক্ষের ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। অভিযোগ ও শাস্তির সিদ্ধান্ত এলেও কোনো ফৌজদারি মামলা হয়েছে কি না, তাও জানানো হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাজনিত শাস্তি এবং আদালতে বিচার দুটি আলাদা প্রক্রিয়া, তাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই শেষ কথা নয়। ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিচয় শুরু থেকেই গোপন রয়েছে এবং তা গোপন রাখাই সংগত। এখন তাঁর নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
সব মিলিয়ে সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত দেখিয়েছে, যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রশাসনিক পর্যায়ে শেষ পর্যন্ত শাস্তি পর্যন্ত গড়াতে পারে। তবে স্বচ্ছতার ঘাটতি এখনো বড়। শাস্তির ভিত্তি, তদন্তের ফল, সময় নেওয়ার কারণ এবং বাকি দুই শিক্ষকের অভিযোগের বিবরণ প্রকাশ হলে সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করে কি না, শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা কী প্রতিক্রিয়া জানান এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে।

