টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে রাতের আঁধারে দুর্গা প্রতিমাসহ সাতটি প্রতিমা ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের জামুর্কী গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় রাধাগোবিন্দ মন্দিরসংলগ্ন আর্য সমিতির দুর্গামন্দিরে এ ঘটনা ঘটে। দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সময়ে হওয়া এই ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনার পেছনে কারা ছিল এবং উদ্দেশ্য কী, তা এখনো জানা যায়নি। পুলিশ বলছে, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
খবর পেয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার শামসুল আলম, মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌহিদ রেজা, মির্জাপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আদনান মুস্তাফিজ, থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লোকমান হোসেন এবং উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বিকাশ গোস্বামী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রশাসনের একসঙ্গে উপস্থিতি ঘটনাটিকে প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলেই ইঙ্গিত দেয়। তবে এই পরিদর্শনের পর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।
জামুর্কী এক নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লুৎফর রহমান জানান, খবর পেয়ে তিনি মণ্ডপে যান। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পূজা উদযাপন কমিটির লোকজন মণ্ডপে উপস্থিত ছিলেন। এরপর রাতের যেকোনো সময় দুর্বৃত্তরা প্রতিমাগুলো ভাঙচুর করে। এ থেকে ধারণা করা যায়, ঘটনাটি ঘটেছে রাত সাড়ে ১০টার পর থেকে ভোরের মধ্যে। মণ্ডপে রাতে পাহারার ব্যবস্থা ছিল কি না এবং সেখানে কোনো নিরাপত্তাকর্মী থাকলে তিনি কিছু দেখেছেন কি না, সে তথ্য এখনো জানা যায়নি। মণ্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তে উঠে আসা দরকার।
জামুর্কী পশ্চিমপাড়া আর্য সমিতির সভাপতি প্রকাশ বাকালী জানান, ৮৭ বছর ধরে এই মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। আগের বছরগুলোয় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এই প্রথম রাতের আঁধারে মণ্ডপের সাতটি প্রতিমা ভাঙচুর করা হলো। প্রায় নয় দশকের পুরোনো এই পূজার ঐতিহ্য এবং এত বছর নির্বিঘ্নে উদ্যাপনের ইতিহাস বিবেচনা করলে ঘটনাটি স্থানীয় সম্প্রীতির পরিবেশের জন্য বড় ধাক্কা। এলাকায় হঠাৎ এমন ঘটনা কেন ঘটল এবং এর পেছনে কোনো স্থানীয় বিরোধ বা বাইরের প্ররোচনা ছিল কি না, তা পুলিশি তদন্তেই স্পষ্ট হবে। এর আগে কোনো হুমকি বা উত্তেজনা ছিল কি না, সে বিষয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মির্জাপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বিকাশ গোস্বামী জানান, নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের জন্য পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, মন্দিরটি পরিদর্শন শেষে নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। সহকারী পুলিশ সুপার আদনান মুস্তাফিজ জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।
জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এখানে লক্ষণীয়, ঘটনার পর সিসি ক্যামেরা বসানো ও বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হলেও ভাঙচুরের সময় মণ্ডপে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ফলে এখন ঘটনার কোনো ভিডিও প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ক্যামেরা কবে বসবে এবং অন্য মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়। এ ছাড়া আইনগত প্রক্রিয়া বলতে মামলা হয়েছে কি না, হলে কারা করেছেন এবং আসামি কারা, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
ঘটনার কয়েকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দুর্গাপূজা সামনে রেখে এমন ঘটনা শুধু একটি মণ্ডপের ক্ষতি নয়, পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করে। তাই দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং তা প্রকাশ্যে জানানো আস্থা ফেরাতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, উদ্দেশ্য না জেনে ঘটনাকে কোনো বিশেষ রঙ দেওয়া ঠিক নয়। এর পেছনে ধর্মীয় বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।
এ বিষয়ে তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে প্রকৃত চিত্র। তৃতীয়ত, গুজব ও উসকানি ছড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল করার সুযোগ যেন কেউ না পায়, সে বিষয়ে প্রশাসনের সতর্ক থাকা জরুরি। এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের খবর নেই এবং ভাঙচুরের ক্ষতির আর্থিক পরিমাণও জানানো হয়নি।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি দেখিয়েছে, উৎসবের আগে ধর্মীয় উপাসনালয় ও মণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসন ও স্থানীয় কমিটির যৌথ। এখন নজর থাকবে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কত দ্রুত অগ্রসর হয়, মামলার অগ্রগতি কী এবং মির্জাপুরসহ আশপাশের মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার দিকে। ক্ষতিগ্রস্ত মণ্ডপে নতুন প্রতিমা স্থাপন করে পূজার আয়োজন স্বাভাবিক রাখা গেলে সেটিই হবে স্থানীয় সম্প্রীতির সবচেয়ে বড় বার্তা।

