রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষককে ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’র সদস্য পরিচয়ে ফোন করে হত্যার হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, গত ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব ফোন আসে। ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন একজন শিক্ষক। ফোনকারীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য এখনো অজানা। পুলিশ বলছে, বিষয়টি তদন্তাধীন। তবে ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় এবং এখন পর্যন্ত কারও গ্রেপ্তারের খবর না থাকায় শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হুমকি পাওয়া শিক্ষকেরা হলেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, গণিত বিভাগের অধ্যাপক গৌর চন্দ্র পাল, সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস, নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন এবং একই বিভাগের শিক্ষক কৌশিক সরকার। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের একই ধরনের ফোন পাওয়ার তথ্য থেকে বোঝা যায়, এটি কোনো একজন শিক্ষককে লক্ষ্য করে করা একক ঘটনা নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি তালিকা ধরে পরিকল্পিতভাবে ফোন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো অনুমান, এর পক্ষে পুলিশের কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মতিহার থানায় জিডি করেন অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, একজন অপরিচিত ব্যক্তি ফোন করে নিজেকে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্য এবং সিরাজ শিকদারের ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। ওই ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেন এবং না দিলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেন। ফোনকারীর নিজেকে সিরাজ শিকদারের ভাই বলে পরিচয় দেওয়া কতটা সত্য, তা যাচাই হয়নি। এ ধরনের পরিচয় ব্যবহারের উদ্দেশ্য হতে পারে ভয় দেখানোর মাত্রা বাড়ানো। পরিচয়টি আসল না ভুয়া, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
শাহরিয়ার হোসেন প্রথম আলোকে জানান, ফোনে তাঁকে ভয় দেখানো হয় এবং কিছু চাঁদা চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেছেন, তিনি শিক্ষক মানুষ, পকেটে টাকা থাকে না। তাঁদের প্রয়োজন হলে যেন ফোন দেন এবং জানান কত টাকা ও কীভাবে নেবেন। এরপর ফোনকারীরা বলেন, পুলিশ, র্যাব বা কাউকে কিছু বলে লাভ হবে না। কথা না শুনলে রাজশাহীতে এমন ঘটনা আরও ঘটেছে বলেও তাঁরা ইঙ্গিত দেন। ফোনকারীর ভাষ্য ছিল, ‘আপনার মাথায় তো রিভলবার ঠেকিয়ে বলা হচ্ছে না, এত লাখ দেন; আপনি বলুন কত দেবেন।’
এই বক্তব্যে একদিকে ভয় দেখানো এবং অন্যদিকে দরকষাকষির সুযোগ রাখার কৌশল দেখা যায়। পুলিশ বা র্যাবকে জানিয়ে লাভ হবে না বলে সতর্ক করাও আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা। ‘রাজশাহীতে এমন ঘটনা আরও ঘটেছে’ বলে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা কোন ঘটনা বোঝায়, তা স্পষ্ট নয়। শাহরিয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনাটি এত প্রচার পেয়েছে যে এখন তিনি বেশি আতঙ্কিত বোধ করছেন।
অধ্যাপক শাহরিয়ার জানান, পুলিশ ফোন নম্বরটি অনুসরণ করে দেখেছে, কলটি করা হয়েছে মাদারীপুর থেকে। অন্য একটি মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন, সিমটি রেজাউল করিম নামের একজনের নামে নিবন্ধিত। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। সিম কারও নামে নিবন্ধিত থাকলেই তিনিই ফোনকারী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অনেক সময় অন্যের পরিচয়ে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করা হয়। তাই ওই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা তদন্তের বিষয়, এবং তিনি অভিযুক্ত নন। কল মাদারীপুর থেকে করা হয়েছে, এই তথ্য ফোনকারীর অবস্থান নিশ্চিত করে না, কারণ একই নেটওয়ার্ক বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবস্থান আড়াল করা সম্ভব। তবে এই সূত্র ধরে তদন্ত এগোনোর সুযোগ আছে।
সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌসকে ৮ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হয়। তিনি প্রথম আলোকে জানান, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি—সর্বহারা থেকে শিমুল বিশ্বাস পরিচয়ে কল করে বলা হয়, গত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী আমলে তাঁদের অনেক নেতা-কর্মী কারাগারে গেছেন। তাঁদের মুক্তির জন্য টাকা দিতে হবে। না দিলে হুমকি দেওয়া হয়। এখানে লক্ষণীয়, ফোনকারী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে চাঁদাকে ‘আন্দোলনের তহবিল’ বা ‘কারাবন্দী নেতা-কর্মীর মুক্তির খরচ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এই পরিচয় ও কথার ধরন অন্য শিক্ষকের কাছে করা ফোনের থেকে কিছুটা ভিন্ন। একজন নিজেকে ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’র সদস্য ও সিরাজ শিকদারের ভাই বলেছেন, আরেকজন ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি—সর্বহারা’ থেকে শিমুল বিশ্বাস পরিচয়ে কথা বলেছেন। এই ভিন্নতা থেকে ধারণা করা যায়, কলগুলো একই ব্যক্তি, একাধিক ব্যক্তি, নাকি বিচ্ছিন্ন কোনো চক্র করেছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। নাম ও দলের পরিচয় দুই ক্ষেত্রেই যাচাই হয়নি।
ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে জানান, তাঁকেও সর্বহারা পরিচয়ে ফোন করা হলে তিনি বেশি কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দেন। পরে তিনি জানতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেক শিক্ষকের কাছে এমন ফোন এসেছে। অর্থাৎ ভুক্তভোগী শুধু এই পাঁচজন নন, সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে কতজন ফোন পেয়েছেন, কতজন চাঁদা দিয়েছেন বা কেউ দিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি। অন্য তিন শিক্ষক, অর্থাৎ গৌর চন্দ্র পাল ও কৌশিক সরকারের কাছে ঠিক কী বলা হয়েছিল, প্রতিবেদনে সে তথ্য নেই।
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরজুন জানান, এ ধরনের একটি অভিযোগ তাঁরা পেয়েছেন এবং বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। তবে তদন্তে এখন পর্যন্ত কী অগ্রগতি হয়েছে, ফোনকারীদের শনাক্ত করা গেছে কি না, মাদারীপুরের সূত্র ধরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। পাঁচজন শিক্ষককে ফোন করা হলেও জিডি করেছেন কেবল একজন। বাকিরা কেন থানায় যাননি, তাঁরা ভয় পেয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব দেননি, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি। ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া বা শিক্ষক সমিতির অবস্থানও জানা যায়নি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনায় প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।
ঘটনার কয়েকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ‘সর্বহারা’ নামটি বাংলাদেশে এক সময়ের সশস্ত্র বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এখন সেই নাম ব্যবহার করে ফোনে চাঁদা দাবি আসলে ওই সংগঠনের কেউ করছে, নাকি আতঙ্ক তৈরির জন্য কেউ নামটি ব্যবহার করছে, তা প্রমাণ ছাড়া বলা যায় না। দ্বিতীয়ত, লক্ষ্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেছে নেওয়া উদ্বেগজনক। এতে শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তৃতীয়ত, ফোনের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও হুমকি এখন প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে সহজেই করা যায়। তাই সিম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই, কল ট্র্যাকিং এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ে পুলিশের সক্ষমতার পরীক্ষা হবে এই ঘটনায়। চতুর্থত, শিক্ষক পরিচয়ে যাঁরা সমাজে তুলনামূলক পরিচিত মুখ, তাঁরাও যদি হুমকির মুখে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখনো তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে একাধিক শিক্ষকের একই ধরনের অভিজ্ঞতা, ফোনের উৎস সম্পর্কে পাওয়া সূত্র এবং থানায় অভিযোগ থাকায় পুলিশের হাতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার মতো উপাদান আছে। এখন নজর থাকবে পুলিশ কত দ্রুত ফোনকারীদের শনাক্ত করে, সিম নিবন্ধনধারীর ভূমিকা কী ছিল, কলগুলো একই সূত্র থেকে এসেছে কি না এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তায় বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে। এ ধরনের হুমকি পেলে দ্রুত থানায় জানানো এবং কল রেকর্ড ও নম্বর সংরক্ষণ করা তদন্তে সহায়ক হতে পারে।

