রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের হোপ মার্কেট এলাকার সড়ক ও ফুটপাত এখন প্রায় ফাঁকা। গত বুধবার অভিযান চালিয়ে হকার ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এরপর পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তির কথা বলছেন। তবে উচ্ছেদের সময় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও আটকের ঘটনা ঘটেছে। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জীবিকার প্রশ্নটিও এখনো অমীমাংসিত।
গতকাল শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২ সড়কের পানির ট্যাংক এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এসে থামে। তাতে ছিলেন দুই নারী। চারপাশে কোনো দোকান, হকার বা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা না দেখে তাঁরা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যান। এত দিনের চেনা জায়গাটি যেন একেবারে অন্য রূপ নিয়েছে।
দুজনই শিক্ষার্থী। তাঁরা শেওড়াপাড়ার একটি ছাত্রীনিবাসে থাকেন। তাঁদের একজন সুরাইয়া মিম, অন্যজন নওশীন জাহান। তাঁরা এসেছিলেন হোপ মার্কেটে কাপড় কিনতে। আগেও এখান থেকে কেনাকাটা করেছেন। বুধবারের অভিযানের খবর তাঁদের জানা ছিল না। কেনাকাটা করতে না পারায় কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও ফাঁকা সড়ক ও ফুটপাত দেখে ভালো লেগেছে বলে জানান তাঁরা।
সুরাইয়া মিম বলেন, সড়কটি যে এত প্রশস্ত এবং পাশে হাঁটার ফুটপাত আছে, এত দিন তা বোঝার উপায় ছিল না। নওশীন জাহান বলেন, হকারদের দোকানের কারণে বাসিন্দাদের কী পরিমাণ ভোগান্তি হতো, ফাঁকা জায়গাটি দেখে এখন তা বোঝা যাচ্ছে।
হোপ প্লাজা নামে একটি ভবনকে ঘিরেই এই এলাকার পরিচিতি। ভবনটির আশপাশের সড়ক ও ফুটপাতে এত দিন যে ভ্রাম্যমাণ বাজার বসত, সেটিই হোপ মার্কেট নামে পরিচিতি পায়।
গতকাল বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কে কোনো ভ্রাম্যমাণ দোকান নেই। ফুটপাতও ফাঁকা। কাঠ ও বাঁশের সঙ্গে বাঁধা পলিথিন বা ত্রিপলের ছাউনিও আর নেই। প্রশস্ত ফুটপাত দিয়ে পথচারীরা স্বচ্ছন্দে হাঁটছেন। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশনের দিকে কয়েক কিলোমিটার এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে।
অভিযানের আগে হোপ মার্কেটকে কেন্দ্র করে বি ব্লকের ১১/১ ও ১১/২ নম্বর লেন, বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পাশের ফুটপাত, মিরপুর আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২-এর সড়ক ও ফুটপাতের বড় অংশ হকারদের দখলে ছিল। ফুটপাতের সীমানাদেয়ালের সঙ্গে বাঁশ ও কাঠ বেঁধে পলিথিন ও ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে দোকান বসানো হতো। মূল সড়কের ভেতরেও দুই থেকে তিন সারিতে অস্থায়ী দোকান ছিল।
এসব দোকানে প্রধানত নারী ও শিশুদের পোশাক, জুতা, অলংকার ও প্রসাধনী বিক্রি হতো। ফুচকা, চটপটি ও ভাজাপোড়ার দোকানও ছিল। অ্যাভিনিউ-২ থেকে ৬ নম্বর লেন পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার সড়কের দুই পাশের ফুটপাত পুরোটাই দখলে ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। গতকাল সেখানে কোনো দোকান দেখা যায়নি। শুধু বুধবার ভেঙে ফেলা দোকানের বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপলের অংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
অভিযানের দিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে। একপর্যায়ে হকার ও দোকানিদের সঙ্গে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে ডিএনসিসির তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। হামলার শিকার হন গণমাধ্যমকর্মীরাও। এ ঘটনায় ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে।
দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তাঁর উপস্থিতিতে মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্ছেদে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ৬ নম্বর লেনের একটি বাসায় প্রায় দুই বছর ধরে থাকেন ফরিদা বেগম। চার বছর বয়সী ছেলে আফসারকে নিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, আগে এখান দিয়ে হাঁটার উপায় ছিল না, বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার প্রচণ্ড ভিড় থাকত। এখন নির্বিঘ্নে হাঁটা যাচ্ছে, ছেলেও নিজে নিজে হাঁটছে।
বি ব্লকের ১১/২ নম্বর লেনের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামও একই কথা বলেন। তাঁর মতে, এত দিন তাঁরা যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন। এখন বাসা থেকে বের হয়ে শান্তি লাগছে। তিনি আশা করেন, ফুটপাত ও সড়ক এভাবেই দখলমুক্ত থাকবে। সিটি করপোরেশন যেন নজর রাখে, যাতে আবার কোনো অবৈধ দখলদারের কবলে না পড়ে।
ফুটপাত পথচারীর, এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। বছরের পর বছর সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে থাকলে চলাচলে ভোগান্তি তো হয়ই, নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য ঝুঁকিও বাড়ে। বাসিন্দাদের স্বস্তির প্রতিক্রিয়া সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে।
তবে ঘটনার অন্য দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব দোকানের ওপর নির্ভর করে বহু পরিবারের আয় চলত। অভিযানের পর তাঁরা কোথায় ব্যবসা করবেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ অনেক সময় সাময়িক সমাধান হয়। কিছুদিন পর হকাররা ফিরে আসেন, এমন নজির রাজধানীতে নতুন নয়।
উচ্ছেদের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন আছে। সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা দেখায়, আগে থেকে সংলাপ বা পুনর্বাসনের আলোচনা তেমন হয়নি বলেই মনে হয়। আগাম নোটিশ, হকারদের সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা এবং নির্দিষ্ট জায়গা বা সময়ভিত্তিক ব্যবস্থা থাকলে সংঘাত এড়ানো যেত বলে অনেকে মনে করেন। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ভিন্নমতও এসেছে।
আরেকটি দিক হলো নিয়মিত তদারকি। একবার দখল সরিয়ে ফেললেই কাজ শেষ হয় না। সিটি করপোরেশন ও পুলিশ নিয়মিত নজর না রাখলে জায়গাটি আবার দখল হয়ে যেতে পারে। বাসিন্দাদের প্রত্যাশাও ঠিক এখানেই।
তাই ফাঁকা ফুটপাত বজায় রাখতে দুটি কাজ একসঙ্গে দরকার। এক, দখল ঠেকাতে ধারাবাহিক নজরদারি। দুই, হকারদের জন্য নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত বিকল্প বাজারের ব্যবস্থা। দুটির একটি বাদ পড়লে সমস্যা ঘুরেফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।
সব মিলিয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের ফাঁকা ফুটপাত নগরবাসীর জন্য স্বস্তির ছবি। কিন্তু এই স্বস্তি টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রশাসন কীভাবে দখল ঠেকায় এবং উচ্ছেদ হওয়া মানুষের জীবিকার বিষয়টি কীভাবে সামাল দেয়, তার ওপর।

