কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে গত ছয় বছরে পাঁচটি শিশুকে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে স্বয়ং শিশুদের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে চারটি ঘটনা ঘটেছে গত দুই বছরে। সর্বশেষ ঘটনাটি থানা পর্যন্ত গড়ালেও পরে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গ্রামবাসীর ভাষ্য, মাদকাসক্তি ও দারিদ্র্যই এসব ঘটনার পেছনের প্রধান কারণ। তবে অভিযুক্ত অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছেন, তাঁরা সন্তানকে বিক্রি করেননি, দত্তক দিয়েছেন। কোনো ঘটনারই প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি, তিনটি শিশুর খোঁজও জানে না তাদের পরিবার।
গ্রামটিতে অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামবাসীর অভিযোগ, ছয় বছরে পাঁচ শিশুকে বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি শিশু একই বাবা-মায়ের সন্তান। দুজন বাবা দাবি করেছেন, তাঁরা সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন এবং এতে কোনো টাকা লেনদেন হয়নি।
সর্বশেষ অভিযোগটি এসেছে গত ২ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া একটি ছেলেশিশুকে ঘিরে। ওই দিন ফারজানা বেগম পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ফারজানার স্বামী অটোরিকশাচালক জাকির মিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগটি করা হয় তাঁর স্ত্রী, স্বজনসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে। জাকিরের দাবি, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
জাকির জানান, স্ত্রী তাঁকে বলেছেন ছেলের বিনিময়ে ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ছেলের মুখটাও দেখতে পারেননি। তাঁর তিন সন্তানের একজনও এখন তাঁর কাছে নেই। নবজাতক কোথায় আছে, তা-ও তিনি জানেন না। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার পর ফারজানা মায়ের বাড়িতে ছিলেন, এখন বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে লুকিয়ে আছেন।
ফারজানা মুঠোফোনে ভিন্ন কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, সন্তান তিনি বিক্রি করেননি, বিক্রি করেছেন তাঁর স্বামী। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী মাদকাসক্ত। দুজনের বক্তব্যে একটি জায়গায় মিল আছে। নবজাতকটি এখন কোথায়, তা তাঁদের কেউই জানেন না। এদিকে কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৯ সেপ্টেম্বর জাকির মিয়া তাঁর অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন।
গ্রামের অন্যান্য ঘটনাও একই ধরনের। গ্রামবাসীর অভিযোগ, ‘বল জাকির’ নামে পরিচিত আরেক জাকির মিয়া ও তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম প্রায় দুই বছর আগে তাঁদের তৃতীয় সন্তানকে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছেন। কয়েকজনের দাবি, তাঁরা দুজনই মাদকাসক্ত ছিলেন। অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর বছরখানেক আগে ফেরদৌসী দুই সন্তান নিয়ে অন্যত্র চলে যান।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় বল জাকির প্রথমে সাড়া না দিয়ে সরে পড়েন। পরে তাঁকে পাওয়া গেলে তিনি বলেন, নেশার টাকার জন্য নয়, সন্তানকে তিনি দত্তক দিয়েছেন। কার কাছে দিয়েছেন, তা বলতে পারেননি। দুই বছরে সন্তানের সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রথমে বলেন হয়েছে, পরে বলেন হয়নি। শেষে জানান, সন্তানের খোঁজ তিনি জানেন না।
সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে দুই সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ আছে। প্রতিবেশী রেহেনা বেগম (৬০) জানান, সাদ্দাম গত এক দশকে তিনটি বিয়ে করেছেন এবং তিনি মাদকাসক্ত। প্রথম স্ত্রীর মেয়েকে ছয় বছর আগে অন্যের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবেশীদের দাবি, তৃতীয় স্ত্রী সোহেনা বেগমের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে তাঁরা নবজাতক ছেলে আলহাতকে বিক্রি করেন। রেহেনা চার-পাঁচ মাস আগেও এই দম্পতিকে দেখেছেন, কিন্তু তখন আলহাত সঙ্গে ছিল না। এখন তাঁদের কাউকেই আর দেখা যায় না।
সাদ্দামের ঘরের টিনের দেয়ালে কোপের দাগ আছে। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, নেশার টাকা না পেলে তিনি ঘরের টিনে কোপাতেন। সাদ্দামের মা নূর জাহান বেগম বলেন, প্রায় ছয় মাস ধরে ছেলের কোনো খবর নেই, নাতির খোঁজ তিনি পাবেন কোথায়। বড় নাতনিকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল এবং তার খোঁজ তিনি জানেন। কিছুক্ষণ ভেবে তিনি বলেন, আলহাতকেও দত্তক দেওয়া হয়েছে, তবে তার হদিস তাঁর জানা নেই। সাদ্দামের ছোট ভাই রাসেল মিয়া বিদেশ থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, ভাই-ভাবির সন্তানেরা কোথায় থাকে, তা তিনি জানেন না।
গ্রামের অনেকের দাবি, প্রায় ১০ মাস আগে আসাদ ফকির ও তাঁর স্ত্রী সোমা আক্তার তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানকে বিক্রি করেছেন। আসাদ বলেন, প্রতিবেশী কুতুব মিয়ার মাধ্যমে তিনি সন্তানকে আত্মীয়ের কাছে দত্তক দিয়েছেন, টাকা নেননি। কুতুব জানান, শিশুটিকে দত্তক নিয়েছেন তাঁর মেয়ে এবং কোনো লেনদেন হয়নি। আসাদের ভাষ্য, শিশুটি এক প্রবাসী পরিবারে আছে এবং তাঁরা মাঝেমধ্যে খোঁজ নেন।
প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। শিশু হাতবদলের কোনো ঘটনারই সাক্ষী পাওয়া যায়নি। জাকির মিয়ার সন্তান ছাড়া বাকি শিশুরা বাড়িতেই জন্ম নিয়েছে। কারও জন্মনিবন্ধনের তথ্যও মেলেনি।
গ্রামের মুদিদোকানে কথা বলা অন্তত ছয়জন ঘটনাগুলোর বড় কারণ হিসেবে মাদকাসক্তির কথা বলেছেন। জাকিরের প্রতিবেশী সুমন মিয়া ক্ষোভ নিয়ে বলেন, চরপুক্ষিয়া এখন যেন মাদকপুক্ষিয়া হয়ে গেছে। মাদকের কারণে ঘর-বাড়ি সব শেষ, এখন নিজের সন্তানও বিক্রি শুরু হয়েছে। অন্য কয়েকজনও জানান, গ্রামে ইয়াবা ও গাঁজার নেশা বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হচ্ছে বলেও তাঁদের মত।
কটিয়াদী থানার একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, চরপুক্ষিয়ায় মাদকের সমস্যা আছে। তবে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তাঁদের মতে, দারিদ্র্য আরও বড় সমস্যা। নতুন যোগ দেওয়া ওসি রফিকুল ইসলামও নেশার টাকার জন্য শিশু বিক্রির অভিযোগ শুনেছেন। তাঁর মতে, দারিদ্র্য ও অসচেতনতাও শিশু বিক্রি বা দত্তক দেওয়ার বড় কারণ।
কটিয়াদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আফরোজ জানিয়েছেন, তিনি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছেন। জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিভাবকেরা চাইলে পাঁচ শিশুকে ফিরিয়ে আনতে তিনি সহযোগিতা করবেন। তবে এর জন্য বাবা-মাকেই আগ্রহী হতে হবে। গ্রামের প্রবীণ আবু কালাম বলেন, বাচ্চা বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়া যায় দেখে কারও কারও লোভ হয়, কারও আবার এটা স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শিশুগুলোর নিরাপত্তা। অভিভাবকদের কেউ বলছেন দত্তক, কেউ বলছেন বিক্রি, কেউ আবার কিছুই জানেন না। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সন্তানকে টাকার বিনিময়ে হস্তান্তর করা গুরুতর অপরাধ হতে পারে। আবার দত্তকের নামে এমন হস্তান্তরও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া বৈধ নয়। এখানে আনুষ্ঠানিক কোনো দত্তকের নথি বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করেছে।
অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, লেনদেনের প্রমাণ নেই এবং অনেক তথ্য প্রতিবেশীদের মুখের কথার ওপর দাঁড়িয়ে। সর্বশেষ অভিযোগটিও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাই কোনো পরিবারকে চূড়ান্তভাবে দোষী বলা যাবে না। তবে একই গ্রামে বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠা এবং শিশুদের অবস্থান অজানা থাকাকে পুলিশ ও প্রশাসনের গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার মতো বিষয় বলে মনে করা যায়।
গ্রামটির চিত্রে মাদক ও দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্র ফুটে ওঠে। নেশার খরচ জোগাতে পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে, আর সেই নিঃস্বতা থেকেই সবচেয়ে অসহায় সদস্য, অর্থাৎ শিশুরা ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রশাসনের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়াচ্ছে। তাই শুধু একটি অভিযোগের তদন্ত যথেষ্ট নয়। মাদকবিরোধী অভিযান, দারিদ্র্য কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জরুরি।
জন্মনিবন্ধনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে জন্ম নেওয়া শিশুদের নিবন্ধন না থাকলে রাষ্ট্রের খাতায় তাদের অস্তিত্বই থাকে না। ফলে কোনো শিশু হারিয়ে গেলে বা হাতবদল হলে তা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিটি নবজাতকের দ্রুত নিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা শিশু সুরক্ষার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
ফেসবুকে দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচার যে প্রবণতার কথা প্রথম আলোর আরেকটি প্রতিবেদনে এসেছে, এই ঘটনা তারই একটি গ্রামীণ উদাহরণ হতে পারে। বৈধ দত্তক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা না থাকায় এবং অনানুষ্ঠানিক পথ সহজ হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে। এ নিয়ে গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো দরকার।
এখন নজর থাকবে ইউএনওর তদন্ত কোন দিকে যায় এবং শিশুগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা যায় কি না, সেদিকে। পুলিশ ও সমাজসেবা অধিদপ্তর এতে কী ভূমিকা রাখে, সেটিও দেখার বিষয়। শিশুগুলো কোথায় আছে এবং নিরাপদ আছে কি না, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। একই সঙ্গে মাদক ও দারিদ্র্যের মূল সমস্যার সমাধান না হলে এমন ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

