ঢাকার মাদক বাণিজ্যে শিশুদের সম্পৃক্ততার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে একটি গবেষণায়। কর্মসংস্থানের অভাব, অর্থনৈতিক সংকট ও জবরদস্তির কারণে শিশুদের একটি অংশ মাদক বিক্রিতে যুক্ত হচ্ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া মাদক বিক্রেতাদের প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা তার কম। বিশেষ করে ইয়াবা বিক্রিতে শিশুদের সম্পৃক্ততা বেশি।
দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের করা এই গবেষণার শিরোনাম ‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’। গত ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী পিএলওএস ওয়ানে এটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণাটি ঢাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ১ হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছর বা তার কম। তাঁদের গড় বয়স ২৬ দশমিক ৭ বছর।
গবেষণা অনুযায়ী, মাদক বিক্রিতে যুক্ত শিশুদের সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ততা ইয়াবায়। হেরোইন বিক্রিতেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। শিশুদের মাদক ব্যবসায় জড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে কর্মসংস্থানের অভাবের কথা এসেছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে জবরদস্তিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবকে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীদের আর্থসামাজিক অবস্থাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের পড়াশোনা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত বা তার নিচে। প্রায় ২৯ শতাংশ ফুটপাতে থাকেন। আরও প্রায় ১০ শতাংশ নিজেদের গৃহহীন বা ভাসমান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেশাদার যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।
মাদক বিক্রির ধরনে এলাকাভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে। ১ হাজার ১৬ জনের মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রি করতেন। ২৮৫ জন শুধু ইয়াবা এবং ২২৮ জন গাঁজা ও ইয়াবা, দুটিই বিক্রি করতেন। ইয়াবা বিক্রেতাদের কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডায় বেশি পাওয়া গেছে। গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রেতাদের উপস্থিতি বেশি ফার্মগেট ও তেজগাঁওয়ে। আর গাঁজা ও হেরোইন বিক্রেতাদের সাভার ও পল্টনে বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় ঢাকায় মাদক ঢোকার কয়েকটি পথও চিহ্নিত করা হয়েছে। হেরোইন মূলত পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনা দিয়ে বাংলাদেশে আসে। পরে সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিলসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে।
গাঁজা প্রবেশের দুটি প্রধান পথের কথা বলা হয়েছে। একটি ভারতের দিক থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে, অন্যটি কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় আসে। ইয়াবার প্রধান উৎস হিসেবে মিয়ানমারের কথা বলা হয়েছে। টেকনাফ সীমান্তের পাশাপাশি ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়েও ইয়াবা বাংলাদেশে ঢোকে। পরে সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন পথে তা ঢাকায় পৌঁছায়।
গবেষণার প্রধান গবেষক যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন বলেন, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা তার কম হওয়া উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, মাদক সিন্ডিকেটগুলো শিশুদের জোর করে বা কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে।
তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, অংশগ্রহণকারী বাছাইয়ে পারপাসিভ ও স্নোবল স্যাম্পলিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এলোমেলো নমুনা নয়। তাই গবেষণার ফলাফলকে পুরো ঢাকা শহরের মাদক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

