অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটই নয়, নদীর প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি। আইন আছে, অভিযানও আছে, তবু ড্রেজার থামছে না।
বাংলাদেশের নদী, চর, কৃষিজমি ও জনপদের ওপর নীরবে নেমে এসেছে এক ভয়ংকর আগ্রাসন: অবৈধ বালু উত্তোলন।
উন্নয়ন, আবাসন, সড়ক, সেতু বা নির্মাণকাজে বালুর বিকল্প নেই। কিন্তু প্রয়োজনের এই বালু যখন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতে অবাধ লুটের পণ্য হয়ে ওঠে, তখন তা আর ব্যবসা থাকে না, হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের সংগঠিত অর্থনীতি।
কোথাও নদীর বুক চিরে রাতদিন চলছে ড্রেজার। কোথাও সরকারি বালু তুলে গড়ে উঠছে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য। কোথাও বৈধ বালুমহালের আড়ালে নির্ধারিত এলাকার বাইরে উত্তোলন চলছে। আবার কোথাও প্রশাসনের অভিযানের পরদিনই নতুন করে সচল হচ্ছে বালুঘাট।
তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু “বালু কে তুলছে?” নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কার ক্ষমতায় তুলছে, কার ছত্রছায়ায় তুলছে এবং কারা এর ভাগ পাচ্ছে? আর এর মূল্য দিতে হচ্ছে নদী ও পরিবেশকে।
একদিন দেখা যাবে, নদী আছে কিন্তু নদীর পাড় নেই; গ্রাম আছে কিন্তু জমি নেই; আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। আর বালু আছে, শুধু রাষ্ট্রের হাতে নেই।
একেকটি নদী, একেকটি লুটের বাজার
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা চিত্র উদ্বেগজনক:
●কুষ্টিয়া-পাবনা (পদ্মা): সীমান্তবর্তী প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় বৈধ ইজারা ছাড়াই কয়েকটি স্থান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকার বালু তোলার অভিযোগ উঠেছে। এতে রাজনৈতিক ব্যক্তি, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতার কথাও এসেছে।
●টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর: অন্তত ৪০টি অবৈধ বালুঘাট আবার সচল থাকার অভিযোগ রয়েছে। ড্রেজার ও বাল্কহেডে বালু উত্তোলন ও পরিবহন চলছে, যা যমুনা সেতু ও রেলসেতুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
●ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেঘনা: একাধিক স্থানে ৫০টির বেশি ড্রেজারে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলসেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
●পটুয়াখালীর রাবনাবাদ: অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে নদীভাঙনের সম্পর্কের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সেখানে শত শত পরিবার ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারিয়েছে এবং বাঁধের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,
একই রোগের বিভিন্ন উপসর্গ।
বালুর ব্যবসা নাকি বালুর রাজনীতি?
একটি বালুঘাট দখল মানে শুধু কয়েকটি ড্রেজার বসানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পুরো শৃঙ্খল:
ড্রেজার → বাল্কহেড → ঘাট → ডিপো → পরিবহন → স্থানীয় প্রভাব → রাজনৈতিক আশ্রয় → প্রশাসনিক নীরবতা
এই চক্র শক্তিশালী হলে নদী হয়ে যায় ব্যক্তিগত খনি। রাষ্ট্রের সম্পদ রাষ্ট্রীয় রাজস্বে না গিয়ে চলে যায় ব্যক্তিগত পকেটে। রাষ্ট্র হারায় রাজস্ব, নদী হারায় স্বাভাবিক গঠন, কৃষক হারায় জমি, মানুষ হারায় বসতভিটা। লাভবান হয় একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে এক গবেষণার বরাতে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি টন বালুর প্রয়োজন, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৩৫ হাজার কোটি টাকা। একই প্রতিবেদনে ৬০–৭০ শতাংশ বালু অবৈধভাবে তোলার একটি হিসাবও উল্লেখ করা হয়। হিসাবটি অনুমানভিত্তিক হলেও বাজারের ব্যাপকতা বোঝাতে তা গুরুত্বপূর্ণ।
যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার, সেখানে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
নদীর পরিবেশ: যা নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে
পরিবেশ ও ভৌগোলিক তথ্য সেবা কেন্দ্র (সিইজিআইএস)-এর নদী ও মোহনা বিশেষজ্ঞ মামিনুল হক সরকারের মতে, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বাংলাদেশে নদীভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। তলদেশে গর্ত তৈরি হলে তীরভাঙন বাড়ে।
●ভাঙনের গতি বাড়ছে: বরিশালের বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদীর ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর প্রস্থ বছরে প্রায় ২৭ মিটার হারে বাড়ছে, যা তীরকে অস্থিতিশীল করছে।
●মাছের প্রজনন ও চলাচল: খোয়াই নদী পরিদর্শনে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, বালু উত্তোলনে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে পানি ঘোলা হচ্ছে, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও চলাচলে বাধা তৈরি করছে। (দ্য ডেইলি স্টার)
●ভূগর্ভস্থ পানি ও আবাস: জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) সূত্র অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন নদীপ্রবাহ বদলে দেয়, নদীতীর ক্ষয় করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে দেয় এবং জলজ আবাস ধ্বংস করে।
●সেতু ও স্থাপনার ঝুঁকি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক সদস্য একটি ওয়েবিনারে বলেন, আইন অনুযায়ী সেতু বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। (টিবিএস নিউজ)
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: ইউএনইপির ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫০০০ কোটি টন বালু ও নুড়ি ব্যবহৃত হয়, যা পানির পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সম্পদ। নদী ও উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান থেকে বালু তুললে ভাঙন, ভূগর্ভস্থ জলাধারে লবণাক্ততা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোথায়, কখন ও কী পরিমাণ বালু তোলা হচ্ছে, তার ওপর পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে। অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন নদীভাঙন ও মাছের প্রজননসহ পরিবেশের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
পটুয়াখালীর রাবনাবাদের চিত্র তারই একটি উদাহরণ, যেখানে শত শত পরিবার ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারিয়েছে।
আইন আছে, তবু বালুবাজি বন্ধ হয় না কেন?
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, মহাসড়ক, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। অবৈধ উত্তোলনে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি ড্রেজার ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী বাজেয়াপ্তের বিধানও আছে।
২০২৫ সালে হাইকোর্ট সরকারকে দেশজুড়ে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। পরিবেশগত, জলপ্রবাহ ও হাইড্রোলজিক্যাল প্রভাব নিরূপণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
তবু ২০২৬ সালেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই অভিযোগ অব্যাহত। অর্থাৎ সমস্যা শুধু আইনের ঘাটতি নয়, প্রয়োগের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতাও।
সমাধান: অভিযান নয়, বালুবাজির অর্থনীতি ভাঙা
শুধু কয়েকটি ড্রেজার জব্দ বা মোবাইল কোর্ট বসিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন:
●ডিজিটাল বালুমহাল ম্যাপ: কোথায় বৈধভাবে বালু তোলা যাবে, কোথায় যাবে না এবং কতটুকু তোলা যাবে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
●পরিবেশগত ও হাইড্রোলজিক্যাল সমীক্ষা: কোনো স্থানে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার আগে নদীর স্রোত, ভাঙনঝুঁকি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেই প্রতিবেদনও প্রকাশ করা জরুরি।
●সংবেদনশীল এলাকা ও মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা: সেতু, বাঁধ ও ভাঙনপ্রবণ এলাকার পাশাপাশি মাছের প্রজনন মৌসুমে ও প্রজননক্ষেত্রে বালু উত্তোলন কঠোরভাবে বন্ধ রাখতে হবে।
●জিপিএস ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং: প্রতিটি ড্রেজারে এটি থাকতে হবে, যাতে নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়।
●বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ প্রকাশ: প্রতিটি বালুঘাটের সঙ্গে যুক্ত ইজারাদার, পরিবহনকারী ও ডিপো মালিকের প্রকৃত মালিকানা জানাতে হবে।
●ক্ষতিপূরণ ও বাজেয়াপ্তির বাস্তব প্রয়োগ: ২০২৩ সালের সংশোধিত আইনে ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় ও ইজারাগ্রহীতার জামানত থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান আছে। শুধু ড্রেজার জব্দ নয়, এর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।
ধরতে হবে বালুর পেছনের টাকা ও ক্ষমতা
আজ একটি বাড়ির পাশে বালু উঠছে। কাল যাবে কৃষিজমি, পরশু নদীর পাড়। তারপর হয়তো রাস্তা, বাঁধ বা পুরো একটি গ্রাম।
বালুবাজি তাই শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের সমস্যা, জননিরাপত্তার সমস্যা, নদী ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক জবাবদিহির সমস্যা।
এই সংকট শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে হলে শুধু শ্রমিক বা ড্রেজার মালিককে ধরলে হবে না। ধরতে হবে বালুর পেছনের টাকা, চিহ্নিত করতে হবে বালুর পেছনের ক্ষমতা, প্রকাশ করতে হবে বালুর পেছনের সিন্ডিকেট।
নইলে একদিন দেখা যাবে, নদী আছে কিন্তু নদীর পাড় নেই; গ্রাম আছে কিন্তু জমি নেই; আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। আর বালু আছে, শুধু রাষ্ট্রের হাতে নেই।

